তারিখ ঘোষণা না হলেও চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থার (সিজেকএস)নির্বাচন নিয়ে সরগরম চট্টগ্রাম স্টেডিয়াম পাড়া। রাজনৈতিক দলের নেতা থেকে শুরু করে নবীন-প্রবীণ ক্রীড়া সংগঠকরা নির্বাচনি মাঠ গোছাতে ব্যস্ত।
তবে ঘুরে ফিরে আসছে একটি প্রশ্ন–আবারও কি রাজনৈতিক দলের বৃত্তে বন্দি হবে সিজেকেএস? নাকি নেতৃত্ব এবার সংগঠকদের হাতে যাবে?
এক যুগের বেশি সময় দেশের অন্যতম বৃহৎ এ ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দিন। এবার সে পদে আসতে চান নগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্কর।
অন্তবর্তীকালীন সরকারের আমলে দেশের বিভিন্ন জেলা ক্রীড়া সংস্থাগুলোর মত ভেঙে দেওয়া হয় আ জ ম নাছিরের নেতৃত্বে থাকা সিজেকেএস কমিটি। সে সময় গঠিত অ্যাডহক কমিটির সঙ্গে স্থানীয় ক্রীড়া সংগঠকদের দূরত্বের কারণে চট্টগ্রামের ক্রীড়াঙ্গন এক প্রকার স্থবির হয়ে পড়েছে।
বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় করা অ্যাডহক কমিটি ভেঙে দিয়ে জেলা ক্রীড়া সংস্থাগুলোতে নতুন করে অ্যাডহক কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যারা নির্বাচন আয়োজন করে নির্বাচিত কমিটির হাতে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেবে।
গত ১০ মার্চ জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের জারি করা এক আদেশে ১০ দিনের মধ্যে কমিটির তালিকা জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে অনুমোদনের জন্য পাঠানোর নির্দেশনা ছিল; কিন্তু মাস পার হলেও চট্টগ্রামে সে কমিটি আলোর মুখ দেখেনি।
ক্রীড়া সংগঠকদের চাওয়া, দ্রুত কমিটি ঘোষণা করে নির্বাচনের আয়োজন করা হোক। নতুন কারো হাতে যাক সিজেকেএস এর নেতৃত্ব।
২০১১ সালে হাফিজুর রহমানকে পরাজিত করে সিজেকেএস এর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন আ জ ম নাছির উদ্দিন। ২০১৩ সালে তিনি নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান।
এরপর ২০১৪ সালে তিনি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন। মেয়র হওয়ার পরও সিজেকেএস এর দায়িত্ব নিজের হাতে রাখেন তিনি। এসব নিয়ে নানা ধরনের সমালোচনা ছিল; তবুও তিনি পদ ছাড়েননি।
আলোচনা আছে, ২০১৫ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে নিজের কার্যালয়ে বসে ‘পছন্দের লোকদের’ নিয়ে তিনি সিজেকেএস এর কমিটি করেছিলেন। ২০১৯ সালে একটি রেস্তোরাঁয় বসে একইভাবে তিনি নির্বাচনবিহীন কমিটি গঠন করেছিলেন।
২০২৩ সালের শেষ দিকে সিজেকেএস নির্বাচন হলেও সে নির্বাচনে আ জ ম নাছির বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। নির্বাচনের আগের দিন নাছিরের বিলি করা ‘স্লিপে’ যাদের নাম দেওয়া হয়েছিল, তারাই নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন বলে সে সময় অভিযোগ উঠে।
আওয়ামী লীগের সরকার পতনের পর আ জ নাছির গা ঢাকা দেন। এবার নাছিরবিহীন নির্বাচনে চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থার নেতৃত্বে আসতে চান বিএনপি নেতা আবুল হাশেম বক্কর।
২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মুক্তিযোদ্ধা ক্রীড়া সংসদের সাধারণ সম্পাদক করা হয় বক্করকে। তার আগে ক্লাবটির এ পদে ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা মশিউর রহমান চৌধুরী।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে এই বিএনপি নেতা বলেন, “কথা সত্য, আমি নির্বাচন করতে চাচ্ছি। বিভিন্ন ক্রীড়া সংগঠক, ক্লাব প্রতিনিধি সবাই বলছে নির্বাচন করতে।”
তিনি বলেন, “চট্টগ্রামের ক্রীড়াঙ্গন নির্জীব, এখন কোনো খেলাধুলা নেই। আমরা চাচ্ছি দায়িত্ব নিয়ে সেগুলো আগের পর্যায়ে নিয়ে যেতে। এটার আলোকেই মূলত নির্বাচন হলে আমি প্রার্থী হব। আগে থেকেই আমি ক্রীড়াঙ্গনের সাথে যুক্ত ছিলাম। এমন না যে, আমি রাজনীতি থেকে ক্রীড়াঙ্গনে যাচ্ছি।”
কমিটিতে রাজনৈতিক নেকাকর্মীদের প্রাধান্য থাকবে কিনা–এমন প্রশ্নে বক্কর বলেন, “ক্রীড়াঙ্গনের জন্য ক্রীড়াঙ্গনের লোকজনকে থাকতে হবে। সব রাজনীতিবিদকে দিয়েতো স্পোর্টস হয় না। অভিজ্ঞ যারা আগের কমিটিতেও ছিলেন, তাদেরসহ সবাইকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে চট্টগ্রামের ক্রীড়াঙ্গনকে এগিয়ে নিতে চাই।”
আবুল হাশেম বক্কর ছাড়াও সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় আছেন সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বিলুপ্ত কমিটির সহ-সভাপতি হাফিজুর রহমান, অতিরিক্ত সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ শাহাব উদ্দিন শামীম, জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক এসএম শহীদুল ইসলাম। তারা তিনজনই চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের পুরানো সংগঠক।
তাদের সঙ্গে আরও কয়েকজন প্র্রবীণ ও নবীন ক্রীড়া সংগঠক বিভিন্ন পদে নির্বাচন করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
পদাধিকার বলে সিজেকেএস এর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক। ছয়জন সহ-সভাপতির মধ্যে নগর পুলিশের উপ-কমিশনার পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা থাকেন। একজন থাকেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক। অন্য চারটি পদে নির্বাচন হয়।

সাধারণ সম্পাদক ও অতিরিক্ত সাধারণ সম্পাদক পদে একজন, যুগ্ম সম্পাদক পদে দুইজন, কোষাধ্যক্ষ পদে একজন নির্বাচিত হন।
নির্বাহী সদস্যদের মধ্যে ১৩ জন নির্বাচনের মাধ্যমে এবং উপজেলা ক্রীড়া সংস্থা থেকে দুইজন, সংরক্ষিত নারী সদস্য দুইজন এবং একজন জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তা সদস্য হিসেবে মনোনীত হন।
চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও আগামী নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থী হাফিজুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সাবেক ক্রীড়াবিদ ও প্রকৃত সংগঠকরা ক্রীড়াঙ্গনের নেতৃত্বে আসবেন এটাই সকল সংগঠকদের চাওয়া। তাদের দক্ষতা অভিজ্ঞতা ক্রীড়াঙ্গনকে এগিয়ে নিতে ও ক্রীড়াবিদ তৈরিতে ভূমিকা রাখবে।
“সংগঠক হতে হলে ধাপে ধাপে শিখে দক্ষ হয়ে উঠতে হয়। উড়ে এসে জুড়ে বসে কেউ ক্রীড়া সংগঠক হতে পারে না।”
হাফিজ বলেন, “যারা রাজনীতি করবেন, তারা রাজনীতিতে মনোযোগ দেবেন, যারা খেলাধুলার মানুষ, তারা খেলাধুলা এগিয়ে নেবে। এভাবেই ভারসাম্য তৈরি হয়।”
তবে বাস্তবতা ভিন্ন। একাধিক ক্লাব প্রতিনিধি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, সিজেকেএস কমিটি মূলত একটি ‘সিণ্ডিকেটের হাতে’ জিম্মি। ঘুরে ফিরে প্রতি কমিটিতেই তারা ‘ভাগভাটোয়ারা করে’ পদ নিয়ে থাকেন। তাদের অনেকের বয়স ষাট পেরিয়েছে।
বিলুপ্ত কমিটির অতিরিক্ত সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ শাহাব উদ্দিন শামীম আগামী নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী হওয়ার কথা জানিয়ে বলেন, “যারা ক্রীড়াঙ্গনের সাথে জড়িত, তারাই নির্বাচনে অংশ নেয়ার কথা। অন্য কোথাও থেকে এসে কেউ নির্বাচনে অংশ নিলেও আমাদের সংগঠকরা ভালোভাবে নেবেন বলে মনে হয় না।
“রাজনীতি করা অপরাধ না। যারা ক্রীড়াঙ্গনের সাথে সম্পৃক্ত তারা এখানে আসা উচিত। কিন্তু শুধু যারা রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত আমি মনে করি তারা রাজনীতিতে থাকা উচিত এখানে আসাটা ঠিক না।”
শাহাবউদ্দিন শামীম বলেন, “অনেকের ধারণা স্পোর্টসে অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয় না। কিন্তু এখানে অনেক বিষয় আছে কোথায় কিভাবে কী করতে হবে। অভিজ্ঞতার একটা বিষয় আছে।”
সিজেকেএস এর সাবেক অতিরিক্ত সাধারণ সম্পাদকের ধারণা, রাজনীতির বাইরে গিয়ে সিজেকেএস কাউন্সিলররা যোগ্য ব্যক্তিকেও নির্বাচিত করবেন।
