অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের (ভিসি) বড় একটি অংশ এখন পদ হারানোর আশঙ্কা করছে। এরই মধ্যে ২০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যকে অব্যাহতি দিয়ে নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিএনপি-জামায়াত ঘরানার শিক্ষকরা উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেলেও বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাদের অনেকের প্রতি সরকার আস্থা রাখতে পারছে না। ফলে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ পাচ্ছেন নতুন উপাচার্যরা। এর সঙ্গে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনসহ নানা অসংগতির অভিযোগও আছে।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, সরকার বদলেছে, দল বদলেছে; কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগের সংস্কৃতি বদলায়নি।
দলীয় বিবেচনায় নতুন উপাচার্য নিয়োগ
গত ১৬ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে নিয়োগ পান পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। তিনি সর্বশেষ বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তাঁর সরাসরি দলীয় পরিচয় রয়েছে। তিনি বর্তমানে বিএনপির শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
অধ্যাপক ওবায়দুল ইসলাম বিএনপিসমর্থিত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সংগঠন ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইউট্যাব) বর্তমান সভাপতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দলের আহ্বায়ক হিসেবেও নেতৃত্ব দেন। বাগেরহাট-৪ আসনে দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতি করে আসছেন এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রেও তিনি ব্যাপক আলোচনায় ছিলেন।
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান। তিনি এর আগে বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির দুবারের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক। এ ছাড়া তিনি বিগত বিএনপি সরকারের আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন অধ্যাপক ড. ফরিদুল ইসলাম। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা জিয়া পরিষদের সাধারণ সম্পাদক।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য পদে নিয়োগ পেয়েছেন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল ফোরকান। তিনি জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম চবি শাখার সাবেক সহসভাপতি।
কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক এ কে এম মতিনুর রহমান। তিনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দলের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক ও ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইউট্যাব) কার্যনির্বাহী সদস্য। তিনি সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও শিক্ষক সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।
গত ১৬ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি অধ্যাপক মামুন আহমেদকে ইউজিসি’র চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দলের আহ্বায়ক ছিলেন। প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের এই অধ্যাপক বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া তিনি জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস)-এর সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়।
ঢাকা বিশ্বিবদ্যালয়ের প্রোভিসি (শিক্ষা) হিসেবে নিয়োগ পান অধ্যাপক আব্দুস সালাম। তিনি ঢাবির সাদা দলের বর্তমান যুগ্ম আহ্বায়ক। আর প্রোভিসি (প্রশাসন) হিসেবে নিয়োগ পান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী। তিনি জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা এবং জীববিজ্ঞান অনুষদ সাদা দলের সাবেক আহ্বায়ক হিসেবে পরিচিত।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) ভিসি হয়েছেন ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক রইস উদ্দিন। তিনি জবি শিক্ষক সমিতির সভাপতি এবং সাদা দলের সাধারণ সম্পাদক।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হয়েছেন অধ্যাপক এম এম শরীফুল করীম। তিনি জাতীয়তাবাদী শিক্ষক সংগঠন ইউট্যাবের কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ভিসি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন ‘সাদা দল’-এর সক্রিয় সদস্য ছিলেন। তিনি এই দলের হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির নির্বাচনেও অংশ নিয়েছেন।
এভাবে দেখা গেছে, প্রতিটি উপাচার্য পদে বিএনপি সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া প্রত্যেকেই নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয় বা কর্মক্ষেত্রে বিএনপির দলীয় শিক্ষক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বা আছেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ভিসি নিয়োগ-সংক্রান্ত সার্চ কমিটির দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ ৫৮টি বিশ্ববিদ্যালয়েই আগের উপাচার্যদের সরিয়ে নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ ১৮ থেকে ২০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে জামায়াতপন্থি শিক্ষকদের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। ২০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে অব্যাহতি পাওয়া উপাচার্যদের মধ্যে বিএনপি ও জামায়াত-সমর্থিতরাও রয়েছেন। এর বেশির ভাগই জামায়াত-সমর্থিত।
বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদত্যাগ করেন। বিএনপিপন্থি পরিচয় থাকার পরও ইতোমধ্যে কয়েকজন উপাচার্য পদ হারিয়েছেন। এর পেছনে মূলত দুটি কারণ কাজ করেছে। প্রথমত, সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রদলের ভরাডুবি এবং প্রশাসনিক নিয়োগে জামায়াতপন্থি শিক্ষকদের প্রাধান্য দেওয়া। দ্বিতীয়ত, প্রশাসনিক দুর্বলতা, ক্যাম্পাসে অস্থিরতা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ এবং ধারাবাহিক আন্দোলন সামাল দিতে ব্যর্থ হওয়া।
পদ হারানোর আতঙ্কের বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন উপাচার্য বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আমার ওপর শিবির-এনসিপি সমর্থিতদের নিয়োগ দেওয়ার চাপ ছিল। কিন্তু আমি নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ রাখি। একজনকেও নিয়োগ দিইনি। তারপরও এখন পদ হারানোর আতঙ্কে থাকতে হচ্ছে।’ আরও কয়েকজন উপাচার্য তাদের পদ হারানোর আতঙ্কের কথা জানিয়েছেন।
উপাচার্য পদে শিগগিরই আরও পরিবর্তন আসছে কিনা জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক গত রোববার বিকেলে তাঁর কার্যালয়ে সমকালকে বলেন, ‘হ্যাঁ।’ কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে পরিবর্তন আসবে–প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকার যেখানে পরিবর্তন দরকার মনে করবে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে কলা ও বাণিজ্য অনুষদের শিক্ষকদের উপাচার্য নিয়োগ করা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি উত্তর দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগে গত মাসে সার্চ কমিটি গঠন করে সরকার। ৬ সদস্যের এ কমিটিতে সভাপতি করা হয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেককে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন–ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ফরিদুল ইসলাম, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সদস্য (পাবলিক ইউনিভার্সিটি) অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান (পরে পদত্যাগ করেছেন), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মোর্শেদ হাসান। কমিটিতে সদস্য সচিব হিসেবে আছেন মাধ্যমিক উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (বিশ্ববিদ্যালয়) আলিফ রুদাবা। এই কমিটির সুপারিশেই বর্তমানে উপাচার্য নিয়োগ হচ্ছে বলে জানা গেছে। কমিটির সবাই সরকারের আস্থাভাজন ব্যক্তি।
দুই বিশেষজ্ঞের মত
বরেণ্য শিক্ষাবিদ ও রাষ্ট্রচিন্তক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, ‘বাংলাদেশে অতীতে যে দলই ক্ষমতায় এসেছে, তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পদে নিজেদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদেরই নিয়োগ দিয়েছে। সরকার বদলেছে, দল বদলেছে; কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগের সংস্কৃতি বদলায়নি।’
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন সমকালকে বলেন, এটি খুব দুর্ভাগ্যজনক যে, বারবার সরকার পরিবর্তন হলেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্য নিয়োগের পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি বা দলীয়করণের ধারা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। এ থেকে কিছুতেই বেরিয়ে আসা যাচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রী নিজেও শিক্ষাকে, শিক্ষক নিয়োগকে দলীয়করণের বাইরে রাখতে পরামর্শ দিচ্ছেন।
তিনি বলেন, যতদিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কোনো বিভাগের শিক্ষক নিয়োগ বোর্ডের প্রধান হিসেবে ভিসি/প্রোভিসি থাকবে আর ভিসি/প্রোভিসি নিয়োগে রাজনীতি থাকবে ততদিন শিক্ষক নিয়োগে রাজনীতি থামানো সম্ভব নয়।
অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুনের অভিমত, ‘উচ্চশিক্ষা কমিশনের অধীনে একটি সার্চ কমিটির মাধ্যমে ভিসি নিয়োগ করা যেতে পারে। এ কমিটিতে দেশি ও বিদেশি বিশেষজ্ঞ সদস্য থাকবেন। সেখান থেকে সৎ ও যোগ্যদের ভিসি হিসেবে বেছে নেওয়া হোক।’ তাঁর মতে, নির্বাচনের মাধ্যমে কখনও যোগ্য ভিসি পাওয়া যাবে না। কারণ, নির্বাচন করতে গেলে নানা সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েই তাদের ভোটে জিতে আসতে হবে এবং সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিম্নমুখী হতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় উপাচার্য নিয়োগ রাজনৈতিক বিবেচনায় দেওয়া হয়েছে কিনা–সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক সম্প্রতি বলেছেন, ‘রাজনীতি করা কি অপরাধ? এটি কি তাদের অযোগ্যতা?’
১৯ জনকে ডিঙিয়ে বুয়েটে ভিসি নিয়োগ
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নতুন উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. একরামুল হককে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাংশের শিক্ষকদের দাবি, একরামুল হককে ভিসি পদে নিয়োগ দিতে গিয়ে ১৯ জন জ্যেষ্ঠ শিক্ষককে ডিঙানো হয়েছে।
সমালোচকদের ভাষ্য, একরামুল হক এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেননি। তিনি কখনও বিভাগীয় প্রধান, অনুষদের ডিন কিংবা অন্য কোনো প্রশাসনিক পদে দায়িত্বে ছিলেন না।
নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি, এক ঘণ্টার মধ্যেই বাতিল
রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) উপাচার্য হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. আনিসুর রহমানকে নিয়োগ দিয়ে জারি করা প্রজ্ঞাপন এক ঘণ্টার মধ্যেই বাতিল করতে হয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে।
গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সহকারী সচিব মো. সুলতান আহমেদের সই করা প্রজ্ঞাপনে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
জানা গেছে, ড. আনিসুর রহমান সাবেক সমাজকল্যাণমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা নুরুজ্জামান আহমেদের আত্মীয় হওয়ায় সামাজিক মাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে সমালোচনা শুরু হয়। এর পরপরই তাঁর নিয়োগ বাতিল করা হয়।
নিপীড়ন, গবেষণা জালিয়াতির অভিযোগ থাকা অধ্যাপক ভিসি পদে
জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমির হোসেন ভূঁইয়া। তাঁর নিয়োগ ঘিরে শুরু হয়েছে বিতর্ক। এরপরও তিনি নতুন কর্মস্থলে যোগ দিয়েছেন।
অধ্যাপক আমিরের বিরুদ্ধে নারীশিক্ষার্থী নিপীড়ন, মানসিক নির্যাতন এবং গবেষণাপত্রে জালিয়াতিসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠন করলেও এখনও তদন্ত শেষ হয়নি।
এর আগে গবেষণাপত্রে জালিয়াতির অভিযোগে ২০১৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও মোহাম্মদ আমির হোসেন ভূঁইয়ার মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া গেছে।
সমাজকল্যাণ ও মার্কেটিংয়ের অধ্যাপককে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ
সাম্প্রতিক নিয়োগে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অ-বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষকদের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া নিয়ে। সরকারি প্রজ্ঞাপনে দেখা গেছে, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন উপাচার্য হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী। টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপচার্য হয়েছেন ঢাবির মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. এ বি এম শহীদুল ইসলাম। তাঁর নিজের বাড়ি টাঙ্গাইলে।
যদিও সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আইনে ‘বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ’ ব্যক্তিকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার কথা বলা আছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মো. মজিবুর রহমান বলেন, ‘আমাদের দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বাস্তবে এখন জেনারেল বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়েছে। সেখানে বাংলা, ইংরেজি, সমাজবিজ্ঞানসহ সব বিষয়ই রয়েছে। ফলে প্রশাসনিক দক্ষতা থাকলে অন্য বিভাগের শিক্ষককে উপাচার্য করাকে বড় অসংগতি বলা যাবে না।’
আন্দোলনের মুখে কোষাধ্যক্ষের পদ হারানো অধ্যাপক এখন ভিসি
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন অধ্যাপক ড. মো. মামুন অর রশিদ। তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ ছিলেন। ২০২৫ সালে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে তৎকালীন কোষাধ্যক্ষ হিসেবে তাঁকে অপসারণ করা হয়েছিল। এসব বিষয়ে অধ্যাপক মামুন অর রশিদ বলেন, ‘যেহেতু আগে এ প্রতিষ্ঠানের কোষাধ্যক্ষ ছিলাম, তাই এটি আমার কাছে পরিচিত ক্যাম্পাস। উপাচার্যের দায়িত্ব গ্রহণের পর শিক্ষকদের নিয়ে বৈঠক করেছি। এখানকার সমস্যাগুলো চিহ্নিত করার চেষ্টা করছি।’
১৫ বছরে ৮ ভিসি বদল, অস্থিতিশীল বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে গত ১৫ বছরে আটজন উপাচার্য দায়িত্ব পালন করেছেন। এর মধ্যে চারজনই মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি। শিক্ষার্থীরা মনে করছেন, প্রশাসনিক অস্থিরতা ও ঘন ঘন নেতৃত্ব পরিবর্তনের কারণে শিক্ষার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ডুয়েটে নতুন ভিসি প্রত্যাখ্যান, সড়ক অবরোধ
গত বৃহস্পতিবার গাজীপুরে অবস্থিত ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট)-এ শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকবালকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। এই নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারির পরপরই তা প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলনে নামেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একাংশ। শুক্রবার জুমার নামাজের পর শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস থেকে মিছিল বের করে ঢাকা-শিমুলতলী আঞ্চলিক সড়ক অবরোধ করেন। তাদের দাবি, ডুয়েট একটি বিশেষায়িত প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়। কাজেই উপাচার্য এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে থেকে দিতে হবে।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, বহিরাগত কাউকে ভিসি করা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বকীয়তা, গবেষণা ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। গত রোববার এ আন্দোলন পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে রূপ নেয়। এতে অন্তত ১৫ জন আহত হন। পরে বিকেলে নতুন উপাচার্য কর্মে যোগ দেন। তবে ক্ষোভ-বিক্ষোভ গতকাল সোমবারও চলছিল।
এক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য
ডুয়েট ছাড়াও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হিসেবে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. জয়নুল আবেদীন সিদ্দিকী। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ পেয়েছেন পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওশানোগ্রাফি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. মামুন অর রশিদ। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দিয়েও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. আনিসুর রহমানের আদেশ পরে বাতিল করা হয়।
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন উপাচার্য হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড রিসার্চের অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি ড. মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন।
পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছেন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড রুরাল ডেভেলপমেন্টের অধ্যাপক ও ট্রেজারার ড. আবুল হাসনাত মোহা. শামীম। অন্যদিকে জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমির হোসেন ভূঁইয়া।
এর আগে গত ১৬ মার্চ বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিদ্দিকুর রহমান খানকে। আর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি অধ্যাপক ড. মো. নুরুল ইসলামকে সেন্ট্রাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।
কমছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাধান্য
দীর্ঘদিন ধরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের প্রাধান্য ছিল। তবে সাম্প্রতিক নিয়োগে সেই প্রবণতায় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। সর্বশেষ ১১টি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ পাওয়া উপাচার্যদের মধ্যে মাত্র দুজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। এর আগে একযোগে নিয়োগ পাওয়া ৯ জনের মধ্যে তিনজন ছিলেন ঢাবির। তথ্য অনুযায়ী, বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর সাধারণ ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নতুন ভিসিদের মধ্যে মাত্র ছয়জন ঢাবির শিক্ষক। অন্যরা নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয় অথবা অন্য ক্যাম্পাসের শিক্ষক।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র বলছে, ভিসি নিয়োগকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ও পেশাগত নানা গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। ফলে শুধু ঢাবিকেন্দ্রিক নিয়োগের ধারা থেকে সরে এসে এখন বিভিন্ন ক্যাম্পাসের শিক্ষকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
