কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার মৃগা ইউনিয়নের আমিরগঞ্জ জনতা বাজার ফেরিঘাটে অন্যের নামে ইজারা নিয়ে ঘাট পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় বিএনপি ও যুবদলের কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে সরকারি নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে দ্বিগুণ ভাড়া আদায়ের অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। এতে প্রতিদিন পারাপার হওয়া সাধারণ যাত্রী, কৃষক ও গরু ব্যবসায়ীরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তবে অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪০ লাখ টাকায় ইটনা উপজেলার মৃগা ইউনিয়নের আমিরগঞ্জ জনতা বাজার ফেরিঘাটটি ইজারা নেন বাবুল দাস নামের এক ব্যক্তি। কিন্তু ইজারা কাগজপত্রে তার নাম থাকলেও বাস্তবে ঘাট পরিচালনা করছেন স্থানীয় বিএনপি ও যুবদলের কয়েকজন নেতা-কর্মী।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী নৌকায় পারাপারের জন্য প্রতি যাত্রীর ভাড়া ৫ টাকা নির্ধারিত থাকলেও বাস্তবে আদায় করা হচ্ছে ১০ টাকা। একইভাবে গরু পারাপারেও নেওয়া হচ্ছে অতিরিক্ত ভাড়া। ছোট গরু পারাপারের নির্ধারিত ভাড়া ৫০ টাকা হলেও আদায় করা হচ্ছে ১০০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত। আর বড় গরুর ক্ষেত্রে ১০০ টাকার পরিবর্তে নেওয়া হচ্ছে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নতুন অর্থবছরে ফেরিঘাটটি ইজারা দেওয়ার পর থেকেই যাত্রী ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় শুরু হয়। আগে যেখানে সরকারি নির্ধারিত ভাড়ায় সাধারণ মানুষ সহজেই পারাপার হতে পারতেন, সেখানে এখন প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে। প্রতিদিন শত শত যাত্রী, কৃষক, শ্রমিক ও গরু ব্যবসায়ী এই ঘাট ব্যবহার করলেও তাদের অভিযোগ শোনার বা প্রতিকার দেওয়ার মতো কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেই।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি নির্ধারিত ভাড়ার কথা উল্লেখ করে কেউ কম টাকা দিতে চাইলে ইজারাদারদের লোকজন ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। অনেক সময় যাত্রীদের সঙ্গে উচ্চস্বরে কথা বলা, অপমানজনক আচরণ করা এবং ভয়ভীতি দেখানোর ঘটনাও ঘটে। কেউ প্রতিবাদ করলে পারাপারে বাধা দেওয়া কিংবা নৌকায় উঠতে না দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয় বলে দাবি স্থানীয়দের।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, সাধারণ মানুষ ঝামেলা এড়াতে বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত ভাড়া পরিশোধ করছেন। বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষ, কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন। প্রতিদিন অল্প অল্প করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হলেও মাস শেষে তা বড় ধরনের আর্থিক চাপ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, ফেরিঘাটে কোনো ভাড়ার তালিকা টাঙানো নেই এবং তদারকির অভাবে ইজারাদারদের লোকজন ইচ্ছামতো ভাড়া আদায় করছেন। দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
গরু ব্যবসায়ী হাজী আব্দুল কাদির বলেন, “আমরা বিভিন্ন এলাকা থেকে গরু নিয়ে এই ঘাট দিয়ে পারাপার করি। কিন্তু কয়েকদিন ধরে এখানে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। সরকারি নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে দ্বিগুণ এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার চেয়েও বেশি টাকা দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। ছোট গরুর জন্যও ১০০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। দূর-দূরান্ত থেকে গরু নিয়ে আসার পর আমাদের আর কোনো বিকল্প থাকে না, তাই বাধ্য হয়ে বেশি টাকা দিতে হয়। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, ফেরিঘাটে কোথাও কোনো ভাড়ার তালিকা টাঙানো নেই। কে কত টাকা নিচ্ছে, তারও কোনো জবাবদিহি নেই। প্রশাসনের নজরদারি না থাকায় সাধারণ ব্যবসায়ীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।”
ভুক্তভোগী তাজুল ইসলাম বলেন, “এই ঘাট দিয়ে প্রতিদিন অনেক সাধারণ মানুষ যাতায়াত করেন। আগে যেখানে জনপ্রতি ৫ টাকা ভাড়া নেওয়া হতো, এখন সেখানে জোর করে ১০ টাকা আদায় করা হচ্ছে। কেউ নির্ধারিত ভাড়া দিতে চাইলে ইজারাদারদের লোকজন খারাপ আচরণ করেন। অনেক সময় যাত্রীদের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়েন এবং কম টাকা দিলে পারাপার না করারও হুমকি দেন। সাধারণ মানুষ ভয়ে কিছু বলতে পারেন না। প্রতিদিন অল্প অল্প করে অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হলেও মাস শেষে সেটা বড় অঙ্কে দাঁড়ায়। আমরা চাই প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে সরকারি নির্ধারিত ভাড়া নিশ্চিত করুক।”
এদিকে ঘাটের ইজারাদার বাবুল দাস বলেন, “ঘাটটি আমার নামে ইজারা নেওয়া হলেও আমি নিজে সরাসরি ঘাট পরিচালনা করি না। খুরশিদ ও সাদ্দাম আমার সঙ্গে কথা বলে আমার নামে ইজারা নিয়েছে। তারা আমাকে কিছু টাকা দিয়েছে এবং সব কার্যক্রম তারাই পরিচালনা করছে। আমি মূলত নামমাত্র ইজারাদার। ঘাটের দৈনন্দিন পরিচালনা, ভাড়া আদায় বা সেখানে কী হচ্ছে—এসব তারা দেখাশোনা করছে। আমাকে শুধু খরচ বাবদ কিছু টাকা দেওয়া হয়েছে।”
স্থানীয়দের দাবি, খোকন মাস্টার, খুরশিদ ও সাদ্দাম স্থানীয় বিএনপি ও যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তাদের প্রভাব খাটিয়েই ফেরিঘাটের পুরো নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়েছেন। এলাকাবাসীর অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে তারা দীর্ঘদিন ধরে ঘাট পরিচালনা করছেন এবং সাধারণ যাত্রী ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছেন। কেউ প্রতিবাদ করলে দুর্ব্যবহার ও নানা ধরনের চাপের মুখে পড়তে হয় বলেও অভিযোগ স্থানীয়দের।
এ বিষয়ে মৃগা ইউনিয়ন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দামের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে অভিযোগের বিষয়ে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে মৃগা ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য সচিব খোকনের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে সাংবাদিক পরিচয় শুনে তিনি পরে কথা বলবেন বলে ফোন কেটে দেন। পরবর্তীতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও তার পক্ষ থেকে আর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে ইটনা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকুজ্জামান ঠাকুর স্বপন বলেন, “বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত নই। তবে কেউ যদি নিয়মবহির্ভূত কোনো কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকে, তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ইটনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাখন চন্দ্র সূত্রধর বলেন, ইজারাদারের লোকজনকে ডেকে সরকারি নির্ধারিত ভাড়া আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফেরিঘাটে নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা সম্বলিত সাইনবোর্ড টাঙানোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। এরপরও কোনো অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, “চলতি বছরে বাবুল দাস নামে এক ব্যক্তিকে ৪০ লাখ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে। ইজারার সব কাগজপত্র ও চুক্তিতে তিনি নিজেই স্বাক্ষর করেছেন। ফলে ইজারাসংক্রান্ত যেকোনো দায়িত্ব ও দায়ভার তার ওপরই বর্তাবে। পরে অন্য কারও নাম উল্লেখ করে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। কারণ সরকারিভাবে যার নামে ইজারা হয়েছে, তাকেই জবাবদিহি করতে হবে। এ বিষয়ে যেসব অভিযোগ পাওয়া গেছে, সেগুলো খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
