সরকারি নিষেধাজ্ঞা এবং স্থানীয় সংসদ সদস্যের কঠোর হুঁশিয়ারিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কুমিল্লার চান্দিনায় তিন ফসলি আবাদি জমি ও পরিবেশ ধ্বংসের মহোৎসবে মেতেছে একটি প্রভাবশালী চক্র। উপজেলার কেরণখাল ইউনিয়নে স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতার যোগসাজশে ‘অবৈধ ড্রেজার’ বসিয়ে চলছে এই বালু তোলার ব্যবসা। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার নাকের ডগায় দীর্ঘদিন ধরে এই অবৈধ কর্মকাণ্ড চললেও অদৃশ্য কারণে স্থানীয় প্রশাসন নীরব ভূমিকা পালন করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রশাসনের কোনো ধরনের অভিযান বা ভ্রাম্যমাণ আদালত না থাকায় স্থানীয় ভুক্তভোগী কৃষকদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও চরম হতাশা বিরাজ করছে।
বুধবার (৩ জুন) দুপুরে সরেজমিনে উপজেলার মাধাইয়া ইউনিয়নের বড় কলাঁগাও গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, সোনাপুর কমিউনিটি ক্লিনিকের দক্ষিণ ও সরকার বাড়ির পূর্বপাশে অবাধে চলছে এক বিশাল পুকুর ভরাটের কাজ। এই ভরাটের বালু জোগাতে কেরণখাল ইউনিয়নের দোতলা কৃষি মাঠে দানবীয় ড্রেজার মেশিন বসিয়ে মাটির গভীর তলদেশ থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই অবৈধ কর্মকাণ্ডের ফলে বিস্তীর্ণ এলাকার কয়েক বিঘা আবাদি কৃষি জমি যেমন ধ্বংস হচ্ছে, তেমনই হুমকিতে পড়েছে গ্রামীণ পরিবেশ এবং সাধারণ কৃষকদের জীবন-জীবিকা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই আবাদি কৃষি জমির মাটি বিক্রি করেছেন কেরণখাল ইউনিয়নের সাবেক প্যানেল চেয়ারম্যান ও ১নং ওয়ার্ডের বর্তমান মেম্বার মো. সেলিম মিয়া। তিনি একজন জনপ্রতিনিধি হয়েও দীর্ঘদিন ধরে আইনকে তোয়াক্কা না করে আবাদি জমি নষ্টের এই অবৈধ ব্যবসা সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছেন। অনবরত বালু তোলার কারণে পানির নিচের মাটি সরে গিয়ে পার্শ্ববর্তী আবাদি জমিতে ভয়াবহ ধস নেমেছে। যেখানে কয়েক বছর আগেও ধান, সবজিসহ বিভিন্ন ফসলের বাম্পার ফলন হতো, সেখানে এখন শুধুই ভাঙনের ক্ষত। আর মেম্বার সেলিম মিয়ার কাছ থেকে মাটির চুক্তি নিয়ে মাঠে ড্রেজার বসিয়েছেন কেরণখাল ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি মো. শামীম খন্দকার (৪০)। ক্ষমতার পালাবদলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এই কুচক্রী মহলটি এখন পুরো এলাকার কৃষির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কৃষক বুকফাটা আর্তনাদ নিয়ে বলেন, ড্রেজার দিয়ে যেভাবে গভীর থেকে বালু তোলা হচ্ছে, তাতে আমাদের চারপাশের আবাদি জমিগুলো ধসে পড়ার ঝুঁকিতে আছে। কিন্তু আমরা অসহায়। মেম্বার আর শামীম খন্দকারের লোকজনের ভয়ে কেউ কথা বলতে সাহস পায় না। মুখ খুললেই রাজনৈতিক চাপ দেওয়া হয়, হামলা-মামলার ভয় দেখানো হয়।
কৃষকরা আরও জানান, আসন্ন কোরবানি ঈদের কয়েকদিন আগে থেকেই এই বালু উত্তোলন ও ভরাট কাজ চলছে। বিষয়টি মৌখিকভাবে প্রশাসনকে জানানো হলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
অভিযোগ অস্বীকার করে ১ নং ওয়ার্ডের মেম্বার মো. সেলিম মিয়া বলেন, জমি আমার না, আমি মাটিও বিক্রি করি না। ড্রেজারও আমি চালাই না। আপনি শামীম খন্দকারের সঙ্গে কথা বলেন। এই বলেই তিনি ফোনের সংযোগ কেটে দেন।
অন্যদিকে, ড্রেজার চালনাকারী বিএনপি নেতা মো. শামীম খন্দকার দাবি করেন, জমি ভরাট করতে গেলে বালু তো লাগেই। আমার জমির মাটি কেটে আমার কেনা জায়গা ভরাট করছি। আমরা সবার সঙ্গে যোগাযোগ করেই কাজ করছি।
অথচ সম্প্রতি কুমিল্লা-৭ (চান্দিনা) আসনের সংসদ সদস্য আতিকুল আলম শাওন অবৈধ ড্রেজার ও বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা করেছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, চান্দিনার কোথাও যেন ড্রেজার বসিয়ে কৃষি জমি নষ্ট করা না হয়। ড্রেজার চললেই সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসন ৪ থেকে ৫ ঘণ্টার মধ্যে কঠোর ব্যবস্থা নেবে।
সংসদ সদস্যের এমন নির্দেশের পরও কেরণখাল ইউনিয়নে আবাদি জমি ধ্বংসের এই মহোৎসব কীভাবে চলছে, তা নিয়ে খোদ ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের মনে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় সংসদ সদস্য আতিকুল আলম শাওন বলেন, অবৈধ ড্রেজার দিয়ে কৃষি জমি ধ্বংসকারীদের কোনো ছাড় নেই। আমি এখনই সহকারী কমিশনার ভূমি ও প্রশাসনকে নির্দেশ দিচ্ছি। খুব দ্রুতই ড্রেজার অপসারণ করা হবে; সে যে দলেরই হোক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
চান্দিনা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কে. এম ইনজারুল হক বলেন, বিষয়টি আমার জানা ছিল না। যেহেতু এখন জানতে পেরেছি, দ্রুত খোঁজ নিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
