দম্পতি হেনস্তার অভিযোগে হল সংসদ নেতার নাম, পাল্টা হুমকির অভিযোগ ছাত্রদল নেতাদের বিরুদ্ধে

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হল © সংগ্রহীত
বিশ্বকাপ ফুটবলের ম্যাচ দেখতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলের মাঠে গিয়ে হল সংসদের সমাজসেবা সম্পাদক সাজু মিয়ার দ্বারা হেনস্তার শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছয় শিক্ষার্থী। এ নিয়ে রাতেই ছাত্রদলের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হুমকিসূচক মন্তব্য এবং এরপর অভিযুক্তের কক্ষে নেতাকর্মিদের নিয়ে পায়চারি করায় নিরাপত্তহীনতার অভিজোগ করেন সাজু।
গত শুক্রবার হেনস্তার শিকার হওয়া ওই নারীর স্বামী বলেন, “রাতে আমি আর আমার ওয়াইফ শহীদুল্লাহ হলের মাঠে খেলা দেখতে গিয়েছিলাম। টিএসসি বা মহসিন হলের মতো জায়গাগুলোতে মেয়েদের সেফটি কনসার্ন থাকে বলে আমরা ভেবেছিলাম শহীদুল্লাহ হলের মাঠটা নিরাপদ হবে। আমরা রাত ১১টার দিকে হলের গেটে নাম এন্ট্রি করেই ভেতরে ঢুকেছিলাম এবং তখন কেউ আমাদের বাধা দেয়নি। আমরা মাঠে আরও কয়েকজন বন্ধু ও জুনিয়রদের নিয়ে মোট ছয়জন বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম, তখনো খেলা শুরু হয়নি।
তিনি আরো বলেন, এমন সময় ৪-৫ জন স্টুডেন্ট এসে আমাদের পরিচয় জানতে চায়। আমি আমার পরিচয় দেওয়ার পরেও তাদের মধ্যে একজন ছাত্র খুব এগ্রেসিভ হয়ে ওঠে, সে প্রায় মারতে আসছিল এমন অবস্থা। তার মূল সমস্যা ছিল কেন ছেলেদের হলে মেয়ে নিয়ে খেলা দেখতে এসেছি। আমি বারবার বললাম যে উনি আমার ওয়াইফ, আমরা ক্যাম্পাসের পরিবেশটা উপভোগ করতে এসেছি, কিন্তু সে কোনো লজিকই শুনতে রাজি ছিল না।”
ভুক্তভোগীর মতামত চাইলে তিনি আরো বলেন আমার ওয়াইফকে আমি নিয়ে গেছি উনি  বারবার যেমনি আমাকে বলতেছিল যে মেয়ে নিয়ে কেন? মেয়ে নিয়ে কেন ? এখানে মেয়ে নিয়ে কেন বসে আছেন মানে আমার ওয়াইফও তো ওর বিহেভিয়ারে মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ছে। গতকাল থেকে ভয়ে আছে কারো সাথে কথা বলতে চাচ্ছে না ।
ঘটনার বিষয়ে গতকাল শনিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর বরাবর অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। এ ছাড়া এই ঘটনায় গতকাল হল প্রাধ্যক্ষ বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছে হল শাখা ছাত্রদল। ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী। এদিকে ঘটনার প্রতিবাদে শনিবার সকালে আর্জেন্টিনা-জর্ডান ম্যাচ উপলক্ষে শহীদুল্লাহ হল মাঠে একত্রিত হয়ে খেলা দেখেন নারী শিক্ষার্থীরা। কবি সুফিয়া কামাল হল সংসদের ভিপি সানজানা চৌধুরী রাত্রী বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখন আর নারীবান্ধব নেই। নারীদের বিচরণ সীমাবদ্ধ করার জন্য একটি গোষ্ঠী পাঁয়তারা চালাচ্ছে।”
হেনস্তার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সাজু মিয়া তিনি দাবি করেন, তিনিসহ কয়েকজন মিলে ওই ছয়জনকে ভদ্রভাবেই চলে যেতে বলেছিলেন। এ কথা বলার পর উল্টো তাঁদের ওপর চোটপাট দেখানো হয়। আর হল মাঠে আসা নারীর সঙ্গে তিনি কোনো কথাই বলেননি। সাজু মিয়া  আরও বলেন, “আমি একদম চ্যালেঞ্জ করতে পারি, যদি ওই আপু বলতে পারেন যে তাঁর সাথে একটা সিঙ্গেল ওয়ার্ড আমার বিনিময় হয়েছে, তাহলে অবশ্যই আমি আপুর কাছে ক্ষমা চাইব।”
পালটা হুমকির অভিযোগ
একই রাতে সাজু মিয়াকে মারধরের হুমকি ও গভীর রাতে তার কক্ষে গিয়ে খোঁজাখুঁজির অভিযোগ উঠেছে ছাত্রদল নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে রোববার হল প্রাধ্যক্ষ ও প্রক্টর বরাবর নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানিয়ে আবেদন করেন সাজু ।
আবেদনে সাজু মিয়া উল্লেখ করেন, শনিবার দিবাগত রাত ১টা ৪০ মিনিটে হল ছাত্রদলের সদস্যসচিব মো. জুনায়েদ আবরারের নেতৃত্বে প্রায় ৯ জন তার কক্ষের সামনে এসে নাম ধরে ডাকাডাকি ও খোঁজাখুঁজি করেন। এ ঘটনায় তিনি ও তার সহপাঠীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। তিনি আরও অভিযোগ করেন, এর আগে সারাদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে আক্রমণাত্মক প্রচারণা চালানো হয়, যা তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এ সময় তিনি প্রশাসনের কাছে পাঁচটি দাবি জানান। সেগুলো হলো-উক্ত ঘটনার নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত করা, সংশ্লিষ্ট সময়ের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও পর্যালোচনা করা, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য গ্রহণ করা, অনিয়ম প্রমাণিত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি বন্ধে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
এদিকে দ্য ঢাকা ডায়েরির হাতে আসা  সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, সাজুর রুমের সামনে পায়চারি করতে দেখা যায় হল ছাত্রদলের সদস্য সচিব ও তড়িৎ প্রকৌশল বিভাগের ২০২২-২৩ সেশনের শিক্ষার্থী মোঃ জুনায়েদ আবরার; হল ছাত্রদলের যুগ্ম-আহ্বায়ক ও সমুদ্রবিদ্যা বিভাগের ২০২১-২২ সেশনের শিক্ষার্থী মাশরাফি ইয়াবিন সজীব; হল ছাত্রদলের যুগ্ম-আহ্বায়ক ও ভূ-পরিবেশ প্রকৌশল বিভাগের ২০২১-২২ সেশনের শিক্ষার্থী আতিক মুসাদ্দিক জিহাদ; হল ছাত্রদলের যুগ্ম-আহ্বায়ক ও ফার্মেসি বিভাগের ২০২১-২২ সেশনের শিক্ষার্থী সিয়ামউদ্দৌলা সিয়াম; হল ছাত্রদলের সদস্য ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগের ২০২২-২৩ সেশনের শিক্ষার্থী সিফাত খান; হল ছাত্রদলের সদস্য ও তথ্য ব্যবস্থা বিভাগের ২০২২-২৩ সেশনের শিক্ষার্থী কামরুজ্জামান কনিক; হল ছাত্রদলের সদস্য ও উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের ২০২৩-২৪ সেশনের শিক্ষার্থী নুর মোহাম্মদ; ভূ-পরিবেশ প্রকৌশল বিভাগের ২০২২-২৩ সেশনের ছাত্রদল কর্মী বাবুল এবং গণিত বিভাগের ২০২২-২৩ সেশনের ছাত্রদল কর্মী তামিম মাহমুদ।
এর আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা মন্তব্য করতে দেখা যায় ছাত্রদল নেতাকর্মিদের ।  সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক মন্তব্যে হল ছাত্রদলের সদস্য সচিব  মোঃ জুনায়েদ আবরার বলেন, “বাইক নিয়ে হলের মধ্যে কয়েকবার রাউন্ড দিলাম, একটাও পাইলাম না, দুঃখজনক।” একই মন্তব্যের প্রতিউত্তরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাড়াবাড়ি করলে উলঙ্গ করে ঝুলিয়ে রাখার নির্দেশনা দেন ছাত্রদল নেতা ও ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের প্যানেল থেকে এজিএস পদে নির্বাচন করা তানভীর আল হাদি মায়েদ।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত জুনায়েদ আবরারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি একটি ফেসবুক পোস্টের লিংক মন্তব্য হিসাবে দেন । তার ব্যাক্তিগত আইডি থেকে করা ওই পোস্টেড় ক্যাপশনে তিনি বলেন,  নারী হেনস্তাকারী সাজু মিয়ার উপর হামলা করা বা হামলা করা চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ তুলে সাজু মিয়া । ভিডিওতে স্পষ্ট  সাজু মিয়া  একজনকে সাথে করে তার রুমে প্রবেশ করে। সে সময় কয়েকজন শিক্ষার্থী নিজেদের মত আড্ডায় ব্যস্ত থাকতে দেখা যাচ্ছে। তারা কেউ সাজু মিয়ার দিকে তাকিয়েও দেখেনি। কিন্তু সাজু অভিযোগ করে সেসব শিক্ষার্থী তার উপর হামলা করার জন্য এসেছে। মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে নিজেকে ভিক্টিম সাজাতে ব্যস্ত নারী হেনস্তাকারী সাজু মিয়া।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ইসরাফিল রতন বলেন, এই ঘটনায় লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি তদন্ত করতে একজন সহকারী প্রক্টরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্ত শেষে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
Facebook
X
LinkedIn
Telegram
WhatsApp
Email