অভিযোগ উঠেছে, একদল সশস্ত্র ব্যক্তি তিনতলা একটি আবাসিক ভবনের তালা ভেঙে, ড্রিল মেশিন দিয়ে দরজা কেটে জোরপূর্বক দখল নেয়। পরে ওই ভবনে বিএনপির দলীয় সাইনবোর্ড টাঙিয়ে কার্যালয় স্থাপন করা হয়।
ঈদুল আজহার আনন্দে যখন মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে ব্যস্ত, ঠিক সেই সময় গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার ঘুড়িদহ ইউনিয়নের ডাকবাংলা বাজারে ঘটে যায় চাঞ্চল্যকর এক ঘটনা। অভিযোগ উঠেছে, ভোরবেলা একদল সশস্ত্র ব্যক্তি তিনতলা একটি আবাসিক ভবনের তালা ভেঙে, ড্রিল মেশিন দিয়ে দরজা কেটে জোরপূর্বক দখল নেয়। পরে ওই ভবনে বিএনপির দলীয় সাইনবোর্ড টাঙিয়ে কার্যালয় স্থাপন করা হয়।
অভিযোগের কাগজ নিয়ে ভুক্তভোগী পরিবারটি বিচারের জন্য কখনো জেলায়, কখনো উপজেলায়, কখনো কেন্দ্রীয় বিএনপি অফিসে ঘুরতে থাকায় বিষয়টি নয়া দিগন্তের নজরে আসে। গাইবান্ধার এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পৃথক মামলা দায়ের করা হয়। এছাড়া র্যাব-১৩, রংপুর ক্যাম্পে লিখিত অভিযোগ এবং গাইবান্ধা প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছে। তবে এখনো দখলমুক্ত করা সম্ভব হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এ ঘটনায় জাতীয়তাবাদী যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-আইনবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট জিল্লুর রহমানের বিরুদ্ধে ভবন দখল, হামলা, ভাঙচুর ও নারীকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগী সানজিদা শেলী শাপলা।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে অ্যাডভোকেট জিল্লুর রহমান দাবি করেছেন, তিনি বৈধভাবে সম্পত্তির অংশ ক্রয় করেছেন এবং কোনো জবরদখল করেননি। মামলার নথি ও ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৭ মে, ঈদুল আজহার আগের দিন ভোর ৫টার দিকে অ্যাডভোকেট জিল্লুর রহমানের নেতৃত্বে ১৫ থেকে ১৬ জন ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র, লাঠিসোটা, লোহার রড, রামদা ও ড্রিল মেশিন নিয়ে ভবনটিতে হামলা চালায়।
অভিযোগ রয়েছে, তারা কলাপসিবল গেটের তালা ভেঙে এবং তিনতলার একটি কক্ষের দরজা ড্রিল মেশিন দিয়ে কেটে ভেতরে প্রবেশ করে পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলা চালায়।
ভুক্তভোগী শাপলার অভিযোগ, হামলাকারীরা তাকে চুলের মুঠি ধরে টানাহেঁচড়া করে এবং শ্লীলতাহানির চেষ্টা চালায়। বাধা দিতে গেলে তার ১৮ বছর বয়সী ছেলে আসিফ রেজা শুভ, বৃদ্ধ বাবা শাহাদুজ্জামান সাজুসহ পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলা চালানো হয়।
শুভকে হাতুড়ি, লাঠি ও বৈদ্যুতিক শক দিয়ে আহত করা হয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। একপর্যায়ে শাপলা ও তার সন্তানদের বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে পুরো ভবনটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় হামলাকারীরা। এ সময় ঘরের শোকেস, ওয়ারড্রোব, ড্রেসিং টেবিলসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র ভাঙচুর করা হয় বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, ঘটনার সময় ৯৯৯-এ ফোন করলেও পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়নি। থানা থেকে ঘটনাস্থলের দূরত্ব অল্প হলেও পুলিশ প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা পর আসে। এর মধ্যেই ভবনটি দখল করে সেখানে বিএনপির সাইনবোর্ড টাঙানো হয়।
অভিযোগ রয়েছে, ঘটনাস্থলে থাকা এক পুলিশ সদস্যও হামলাকারীদের পক্ষ নিয়ে ভূমিকা পালন করেন। মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ঝাড়াবর্ষা গ্রামের আশরাফুল ইসলাম ও তার স্ত্রী সানজিদা শেলী শাপলা ২০১৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর পাঁচ শতক জমি ক্রয় করেন। পরে সেখানে তিনতলা ভবন নির্মাণ করে বসবাস শুরু করেন।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, সাবেক সেনাসদস্য আশরাফুল ইসলাম চাকরি থেকে অবসরের পর অনলাইন জুয়া ও ক্যাসিনোয় জড়িয়ে পড়েন এবং একপর্যায়ে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। পরিবারের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে শাপলা ২০২৫ সালের ২ জুলাই তার মালিকানাধীন জমি ও ভবনের অংশ দুই নাবালক ছেলের নামে দলিল করে দেন। অভিযোগে আরো বলা হয়েছে, চলতি বছরের ১৫ এপ্রিল অ্যাডভোকেট জিল্লুর রহমান আশরাফুল ইসলামকে বিভ্রান্ত করে তার মালিকানাধীন অংশের ফাঁকা জমি নিজের নামে দলিল করে নেন।
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, ওই দলিলকে কেন্দ্র করেই পরবর্তীতে পুরো ভবন দখলের ঘটনা ঘটানো হয়। শাপলার বাবা শাহাদুজ্জামান সাজু বলেন, ঘটনার পর আহতদের সাঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেয়া হয়। পরে থানায় অভিযোগ করতে গেলে মামলা গ্রহণ না করে আদালতে যাওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়।
পরে গাইবান্ধার এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পৃথক মামলা দায়ের করা হয়। এছাড়া র্যাব-১৩, রংপুর ক্যাম্পে লিখিত অভিযোগ এবং গাইবান্ধা প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছে। তবে এখনো দখলমুক্ত করা সম্ভব হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
অন্যদিকে আশরাফুল ইসলাম বলেন, তিনি নেশাগ্রস্ত নন এবং অনলাইনে জুয়া খেলেন না। তার বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগ মিথ্যা। স্ত্রী তার অংশ দুই ছেলের নামে লিখে দিয়েছেন, এ বিষয়েও তিনি আগে জানতেন না। পরে দলিল করে দেয়ার পরেই জানতে পেরেছেন। এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতা অভিযোগ করেন, এ ঘটনায় দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। তারা বিষয়টি তদন্ত করে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান। এ বিষয়ে অ্যাডভোকেট জিল্লুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেন।
তিনি বলেন, ‘এলাকার বিএনপির নেতাকর্মীরা আমাকে একটি দলীয় কার্যালয়ের ব্যবস্থা করে দেয়ার অনুরোধ করেছিলেন। সে কারণেই আমি ভবনটির অংশ স্কয়ার ফুট হিসেবে বৈধভাবে ক্রয় করেছি। বাড়িটি আমি জোরপূর্বক দখল করিনি। আশরাফুল ইসলাম স্বেচ্ছায় তার মালিকানাধীন অংশ আমার কাছে বুঝিয়ে দিয়েছেন। আমার নিজস্ব বাড়ি রয়েছে, তাই ভবনটি বিএনপির পার্টি অফিস হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।’
এ বিষয়ে সাঘাটা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘জিল্লুর রহমান জায়গা কিনেছেন বলে শুনেছি। তবে সেখানে বিএনপির সাইনবোর্ড কেন দেয়া হয়েছে, তা আমার জানা নেই। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
