যুবদল নেতা বাবুকে হত্যায় কিলার ভাড়া করেন হাফিজ

রাজধানীর কাফরুলে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত যুবদল কর্মী ইউসুফ আলী ওরফে পারভেজ হত্যার ঘটনায় মামলা করেছে পরিবার। এতে শুটার চঞ্চল মোল্লাসহ চারজনের নাম উল্লেখ ও ৪-৫ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। এ ঘটনায় থানা ও ডিবি পুলিশ ৫ জনকে গ্রেফতার করেছে। হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল করেছেন দলীয় নেতাকর্মীরা।

হত্যাকাণ্ডের মূল টার্গেট ছিলেন কাফরুল থানা যুবদল নেতা হাফিজুল ইসলাম বাবু। কিন্তু টার্গেট মিস হওয়ায় তিনি বেঁচে যান। তাকে হত্যার জন্য ঝিনাইদহ ও মাগুরা থেকে কিলার ভাড়া করে আনেন কাফরুল থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা হাফিজুর রহমান হাফিজ। কিলাররা মিরপুরের একটি হোটেলে কয়েক দিন অবস্থান করে ঘটনাস্থল রেকি করেন।

সূত্র জানায়, মূলত আধিপত্য বিস্তার, দখল, চাঁদাবাজি, ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণসহ নানা কারণে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর যুবদল নেতা হাফিজুল ইসলাম বাবু প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। তার বিরুদ্ধে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ফেলে যাওয়া ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, জমি ও ডিশ লাইনের ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে নিজ দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে শত্রুতা তৈরি হয়েছে।

পুলিশ জানায়, নিহত যুবদল কর্মী ইউসুফ আলীর বড় ভাই মাসুদ রানা বাদী হয়ে শনিবার কাফরুল থানায় এ মামলা করেন। এতে পুলিশের কাছে আটক চঞ্চল মোল্লাসহ চারজনের নাম উল্লেখ ও ৪-৫ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। অন্য তিন আসামি হলেন জিহাদ মোল্লা, জিয়ারুল মোল্লা ও হাসান। চঞ্চলকে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে। আদালত তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের রিমান্ড দিয়েছেন।

মামলার এজহারে যা বলা হয়েছে : মালার এজাহারে বলা হয়, কাফরুল থানা যুবদলের সদস্য সচিব হাফিজুল ইসলাম বাবুর সঙ্গে তার ছোট ভাই ইউসুফের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। রাতে ইউসুফ অন্যদের সঙ্গে ওপেক্স গার্মেন্টের পাশে রাস্তায় দাঁড়িয়ে বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ করছিলেন। এ সময় বিবাদীরা পূর্ব পরিকল্পিতভাবে ঘটনাস্থলে এসে গুলি করলে ইউসুফের বুকের ডান পাশ দিয়ে ঢুকে পিঠ দিয়ে বের হয়ে যায়। এ সময় অন্য আসামিরা এলোপাতাড়ি গুলি করলে পাশে থাকা সবজি বিক্রেতা নালাম সরদার ও মনির হোসেন গুলিবিদ্ধ হন। নালামের মাথার ডান পাশে ও মনিরের ডান পায়ে গুলি লাগে। ঢাকা মহানগর পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মোস্তাক সরকার বলেন, কী কারণে গুলির ঘটনা ঘটেছে, এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। শিগগিরই তাদের গ্রেফতার করা সম্ভব হবে।

শুটার ও সহযোগীসহ গ্রেফতার ৫ : ঘটনার পর শুক্রবার রাতে স্থানীয় জনতা শুটার চঞ্চলকে আটক করে থানায় হস্তান্তর করে। পরে শনিবার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও থানা পুলিশ পৃথক অভিযান চালিয়ে আরেক শুটার জিয়ারুল হক মোল্লা ও তিন সহযোগীকে গ্রেফতার করে। অন্যরা হলেন-শুটার জিয়ারুল হক মোল্লা জিয়ার সহায়তাকারী নাহিদ হাসান ওরফে মেহেদী হাসান, সাফিন ছৈয়াল ওরফে সাফিন আহম্মেদ ও আলী হোসেন। এর মধ্যে নাহিদ পিস্তলটি অন্য একজনের কাছ থেকে সংগ্রহ করে শুটারকে দেয়। সাফিন ও আলী ঘটনাস্থল রেকিসহ সার্বিক বিষয়ে শুটারদের সহযোগিতা করে।

যেভাবে গুলি ও হত্যাকাণ্ড : প্রত্যক্ষদর্শী সুজন যুগান্তরকে বলেন, তারা রাতে হাফিজুল ইসলাম বাবুর সঙ্গে গল্প করার সময় নিহত ইউসুফ অপরিচিত তিনজনকে দেখে সন্দেহ করে। অপরিচিতরা টের পেয়ে দ্রুত হেঁটে ১ নম্বরের রাস্তার মাথার দিকে আসে। এ সময় বাবু ভাই তাদের ধরতে বলে। তখন দৌড় দিতে শুরু করলে তাদের কাছে গিয়ে পরিচয় জানতে চাওয়া হয়। তারা মিরপুর ১০ নম্বর এলাকার বলে জানায়। সুজন আরও জানায়, ৩ জনের সঙ্গে কথা বলার সময় অপর একজন কোমরে হাত দিছে কিছু একটা বের করার জন্য। তাৎক্ষণিক ইউসুফ তাকে জাপটে ধরে ফেললে কোমর থেকে পিস্তল বের করে ইউসুফের বুকে গুলি করে দেয়। এ সময় আমার দিকে দুই রাউন্ড গুলি করে, যা টার্গেট মিস হয়ে দুই পথচারীর গায়ে লাগে। এছাড়া বাবু ভাইয়ের দিকেও দুই রাউন্ড গুলি ছোড়ে। পরে সবাই দৌড়ে শুটার চঞ্চলকে আটক করে মারধর করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে।

ঝিনাইদহ ও মাগুরা থেকে কিলার ভাড়া : পরিচয় শনাক্ত হওয়া কিলারদের চারজনের গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহ ও মাগুরা এলাকায়। ধরা পড়া চঞ্চল মোল্লার বাবার নাম আতিয়ার মোল্লা। গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার রাড়ীপাড়ায়। এছাড়া জিহাদ মোল্লার বাবার নাম মৃত রওশন আলী মোল্লা। তার বাড়ি কালীগঞ্জ উপজেলার দামোদরপুরে। জিয়ারুল মোল্লার বাবার নাম আনোয়ার পাটোয়ারী। তার বাড়ি মাগুরার শালিখা উপজেলার আড়পাড়ায়। আরেক আসামির নাম হাসান। তবে এজাহারে তার ঠিকানা উল্লেখ করা হয়নি।

ডিবির মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. রাকিব খান যুগান্তরকে জানান, কয়েক দিন আগে শুটারদের ভাড়া করে ঢাকায় আনা হয়। গ্রেফতার অন্যরা শুটারদের সঙ্গে নিয়ে হত্যাকাণ্ডের স্থান রেকি করে কাকে গুলি করতে হবে সেটি বুঝিয়ে দেয়।

ডিবির সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, মূলত স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা হাফিজুর রহমান হাফিজ যুবদল নেতা হাফিজুল ইসলাম বাবুকে হত্যার জন্য কিলারদের ভাড়া করেন।

আধিপত্য ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব : স্থানীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ, ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ডিশ ও ইন্টারনেট ব্যবসা, সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি দখল, গার্মেন্টের ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণসহ নির্মাণাধীন ভবনে চাঁদাবাজি শুরু করেন হাফিজুল ইসলাম বাবু। এর মধ্যে কাফরুল থানা আওয়ামী লীগ নেতা ডিএসপি বাবুর তিনটি টিনশেড বাড়িও তিনি দখল করেন।

মিরপুর ১৩ নম্বরের বিজয় রাকিন সিটির অ্যাপার্টমেন্ট ওনার্স কো-অপারেটিভ সোসাইটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, বাবু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রাকিন সিটির তিনটি ভবনে ২৫টি ফ্ল্যাট দখলে নিয়ে ভাড়া দিয়েছেন। এছাড়া একটি ফ্ল্যাট দখলে নিয়ে নিজে মালিক সেজেছেন। অভিযোগের বিষয়ে বাবু বলেন, আমরা ১৭-১৮ বছর এলাকার বাইরে ছিলাম। ফলে দখলের সুযোগ ছিল না। এছাড়া আওয়ামী লীগ নেতা ডিএসপি বাবুর তিনটি টিনশেড বাড়ি দখলের বিষয়টি সত্য নয়। সরকারি ও মালিকানা জমি দখল করে বাড়িগুলো করা হয়েছিল, যা ৫ আগস্টের পরে জমির মালিকরা পুনরুদ্ধার করেছেন।

সংকটাপন্ন নালাম সরদার, উজিরপুরে ইউসুফের লাশ দাফন : মাথায় গুলিবিদ্ধ নালাম সরদারের ছেলে আব্দুল্লাহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বলেন, ঘটনার সময় তার বাবা ও বড় ভাই সজীব সরদার পাশাপাশি ছিলেন। গুলি লাগার পরও তারা প্রথমে বিষয়টি বুঝতে পারেননি। নালামকে হতভম্ব দেখে সজীব জিজ্ঞেস করেন, ‘বাবা কি ভয় পাইছ?’ তারপরই তিনি লক্ষ করেন, নালামের মাথা থেকে রক্ত পড়ছে। পরে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।

নিহত ইউসুফের এক ভাই সুমন বেপারী ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গের সামনে জানান, তার ভাই ইউসুফ বিয়ে করেননি। মূলত রাজনীতি নিয়েই পড়ে থাকতেন। চার ভাইবোনের মধ্যে ছোট ছিলেন তিনি। ময়নাতদন্ত শেষে কাফরুলে একটি জানাজার পর ইউসুফের লাশ দাফনের জন্য বরিশালের উজিরপুরের গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হবে।

মিরপুরে যুবদলের বিক্ষোভ : যুবদল কর্মীকে গুলি করে হত্যা ও কাফরুল থানা যুবদলের সদস্য সচিবকে লক্ষ্য করে গুলির ঘটনায় প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে জাতীয়তাবাদী যুবদল। শনিবার বিকাল সাড়ে ৪টায় মিরপুর-১৩ নম্বর হারম্যান মেইনার কলেজের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিলটি শুরু হয়। মিছিলের আয়োজন করেন ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদল। মিছিলের আগে যুবদল নেতা ইউসুফের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের ২৬টি থানা ও ৭১টি ওয়ার্ডের কয়েক হাজার নেতাকর্মী এই মিছিলে অংশ নেন। মিছিলটি মিরপুর-১৩ থেকে শুরু হয়ে বিআরটিএ হয়ে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরে গিয়ে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের মাধ্যমে শেষ হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন, ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের আহ্বায়ক শরীফ উদ্দিন জুয়েল ও সদস্য সচিব সাজ্জাদুল মিরাজ।

Facebook
X
LinkedIn
Telegram
WhatsApp
Email