আমেরিকা প্রবাসীর ঘর নির্মাণে বিএনপি নেতার নেতৃত্বে সশস্ত্র বাধা

ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার আমলে ছিলেন ভেজা বেড়াল। থানা-পুলিশ থেকে যোজন দূরত্ব বজায় রেখে চলতেন আতঙ্কে। কিন্তু দিন বদলেছে এবার নেকড়ে বাঘে যেন পরিণত হয়েছেন। স্থানীয় থানা পুলিশে ব্যাপক প্রভাব তার। থানা-পুলিশ-দলে তিনি শক্তিধর। হবিগঞ্জ মাধবপুর উপজেলায় একচ্ছত্র রাজত্ব করেন শামসুল ইসলাম কামাল। প্রকাশ্য দিনদুপুরে রাখঢাক না রেখেই এক আমেরিকা প্রবাসীর গৃহ নিমার্ণ বন্ধের হুমকি দিয়েছেন তিনি। দাবি করেছেন ২০ লাখ টাকা। দাবি পূরণ না করলে প্রাণনাশসহ গুমের ভীতিও দিয়েছেন তিনি ও তার ৫ সহযোগী।

গত ১৬ আগস্ট বেলা সাড়ে ১১টায় এ ঘটনা ঘটে হবিগঞ্জের পশ্চিমবাজারস্থ এলাকায়। এ ঘটনায় এলাকায় দেখা দিয়েছে চাঞ্চল্য। এ ঘটনার ভিডিও ধারণ করেছেন উপস্থিত অনেকে। ঘটনাটি নিস্পত্তি না হওয়ায় হবিগঞ্জের দ্রুত বিচার আদালতে প্রতিকার চেয়ে গত বৃহস্পতিবার একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন আমেরিকা প্রবাসীর পুত্র সানি আলম শ্রাবণ (১৮)।
অভিযোগে প্রধান আসামি ধর্মঘর ইউনিয়নের কালিকাপুর গ্রামের মৃত মো. হাফিজ উদ্দিনের পুত্র ও মাদবপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. শামসুল ইসলাম কামাল (৫৮)। এছাড়াও অন্য সহযোগী আসামিরা হচ্ছেন- মালঞ্চপুর গ্রামের ইমরান আহমেদ (৪০), আলীনগর গ্রামের মো. আশিকুর রহমান ওরফে মামুন মেম্বার (৪৫), একইগ্রামের কুদ্দুছ মিয়া (৩০) ও কালিকাপুর গ্রামের শাহ আলম (৫২)। এছাড়া অজ্ঞাতনামা আসামি হিসেবে রয়েছেন ১০/১২ জন। অভিযোগটি গুরুতর ও আমলযোগ্য হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে স্থানীয় থানা পুলিশকে অভিযোগটি সিআরপিসির ১৫৬(৩) ধারা অনুসারে এফআইআর হিসেবে গণ্যের আদেশ দিয়েছেন হবিগঞ্জের দ্রুত বিচার আদালতের বিচারক মোহাম্মদ শাহেদুল আলম। আদেশ প্রাপ্তির ৩ দিনের মধ্যে এফআইআর হিসেবে বিষয়টি অবহিত করার নির্দেশও প্রদান করেছেন আদালত।

এ ব্যাপারে মাধবপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সোহেল রানা বলেন, মামলা রেকর্ডের নির্দেশনা সম্বলিত অভিযোগপত্রটি হস্তগত হয়েছে তার। ৩ দিনের মধ্যে অভিযোগটি এফআইআর হিসেবে গণ্যের সময়সীমা দেয়া হয়েছে। তাই পুলিশ যথাসময়ে রেকর্ড করত প্রয়োজনীয় পদেক্ষপ গ্রহণ করবে বলে জানান।
এছাড়া আসামিরা রাজনীতিক প্রভাবশালী হওয়ায় পুলিশ বিব্রত কি না এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। এমনকি আসামি প্রভাবশালী হওয়ায় বাদীর কোনরূপ নিরাপত্তা ঝুঁকি দেখা দিলে, তাকে অবগত করার জন্য বলেন।
জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকা প্রবাসী শাহিনুর আলম। দেশের মাটিতে স্বপ্ন বুনছিলেন গৃহ নির্মাণের। তাই জমি কিনে বাড়ি তৈরির প্রস্তুতি নেন তিনি। তার অবর্তমানে সেই কাজের দায়িত্ব নেন ছেলে সানি আলম শ্রাবণ। ক্রয় করেন ইট পাথর বালুসহ অন্যান্য নির্মাণ সামগ্রী। এরমধ্যে মামলার প্রধান আসামি মো. শামছুল ইসলাম কামাল আমেরিকা প্রবাসী শাহিনুর আলমের সাথে যোগাযোগ করে দাবি করেন বাড়ি নির্মাণ করতে হলে দিতে হবে ২০ লাখ টাকা। দাবি প্রত্যাখান করেন প্রবাসী শাহিনুর। এমতাবস্থায় শুরু হয় বাড়ি নির্মাণ। চলমান নির্মাণ কাজের এক পযার্য়ে সরাসরি উপস্থিত হন প্রধান আসামি ও তার ৫ সহযোগী। নির্মাণস্থলে ভীতিকার এক পরিবেশ সৃষ্টি করে হুংকার দিয়ে প্রকাশ্য দাবি করেন ২০ লাখ টাকার চাঁদা।

একপর্যায়ে নির্মাণ মিস্ত্রি হুছন আলিকে ঘিরে বলেন, এখানে নির্মাণ কাজ করতে হলে আমাদেরকে নগদ টাকা প্রদান করতে হবে। নতুবা যারা এখানে নির্মাণ কাজে থাকবে তাদের প্রাণে হত্যা করে লাশ গুম করে ফেলব। এসময় আসামিদের আচরণের প্রতিবাদ করলে অজ্ঞাতনামা ৪/৫ জন আসামি বাদীকে টেনে হিচড়ে ঘটনাস্থলে মারপিট করতে থাকে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত কয়েকজন মোবাইলে ঘটনাটি ভিডিও ধারণ করলে সকলকে আক্রমণ করে মোবাইলগুলো ছিনিয়ে নিয়ে যায়। নির্মাণ মিস্ত্রি কাজ বন্ধে অনীহা প্রকাশ করলে সবাইকে সায়েস্তা করবে এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবে উল্লেখ করে নির্মাণ শ্রমিকদের ছবি উঠানোর নির্দেশ দেয় আসামিরা।
স্থানীয় সূত্র মতে, ধর্মঘর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ছিলেন শামসুল ইসলাম কামাল। ফ্যাসিস্ট আমলে মিলেমিলে এলাকায় নির্ভার ছিলেন তিনি। কিন্তু স্বৈরাচার শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর সামনের কাতারে চলে আসেন। স্থানীয় এলাকায় তার হুকুম-ই শেষ হুকুম এমন ভাব। নিরীহ লোকজন, ভয়ে থাকে তটস্থ। কারণ থানা পুলিশে প্রভাব তার। এছাড়া বিএনপির স্থানীয় এ শীর্ষ নেতার বলয়ের লোকজনও বেপরোয়া। তারা মনে করে থানা পুলিশ তাদের ম্যানেজে। কেউ কিছু বলতে বা করতে পারবে না তাদের।
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, তারা আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন প্রতিকার প্রত্যাশায়। আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন করবেন পুলিশ। কিন্তু পুলিশ পেশাদারিত্ব বজায় রেখে কতটুকু করবে সেই প্রশ্ন তাদের। বিবাদীদের অনেকে বলে বেড়াচ্ছেন পুলিশ দিয়ে কিছু করাতে পারবে না তাদের। কারণ পুলিশ তাদের। পুলিশের তৎপরতায় বিবাদীদের কথার মিল প্রতীয়মান হচ্ছে বলে মনে করছেন তারা। এতে বাদী তার নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত এখন।

Facebook
X
LinkedIn
Telegram
WhatsApp
Email