আশ্রয়ণে ঘর বরাদ্দের নামে চাঁদাবাজি

কৈতুরী খাতুন (৫৫) ও চান্দ আলী (৬২) দম্পতি চাতাল শ্রমিক। তারা কাজ করেন ঝিনাইদহ সদর উপজেলার পদ্মাকর ইউনিয়নের হাটগোপালপুরের একটি চাতালে। অসুস্থতার কারণে কাজের ক্ষমতা অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছেন কৈতুরী। এখানে-ওখানে থাকতে থাকতে ক্লান্ত এই নারী জীবনের শেষ সময়টুকু কাটাতে স্থায়ী আশ্রয় খুঁজছিলেন। একজন লোকের কাছে উপজেলার হরিশংকরপুর ইউনিয়নের পৈলানপুর-পাইকপাড়া মৌজায় অবস্থিত সরকারি আশ্রয়ণের কথা শোনেন। তাঁর মাধ্যমেই সেখানে একটি ঘর মেলে। তবে এ জন্য হাড়ভাঙা খাটুনির পর সঞ্চিত সাড়ে ১১ হাজার টাকা গুনতে হয় কৈতুরীকে।

অসহায় এই নারীর অভিযোগ, তাঁর কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন আশ্রয়ণের সভাপতি শান্ত মণ্ডল। শান্ত আবার হরিশংকরপুর ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক সভাপতি রিমন মণ্ডলের ভাই। গত বুধবার নিজের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে গলা ধরে আসে কৈতুরী খাতুনের। তিনি বলেন, ‘আমি খুব অনুনয়-বিনয় করেছি, কিন্তু টাকা কম নেয়নি। একটু থাকার জায়গার জন্য বাপ এতগুলো টাকা দিতে হলো।’

সরকারি এই আশ্রয়ণ প্রকল্পে ঘর বরাদ্দের জন্য চাঁদা আদায়ের জন্য শান্ত মণ্ডল ও রিমন মণ্ডলের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন অন্তত ৩০ জন ভুক্তভোগী। তাদের পক্ষে গত ১১ নভেম্বর জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগপত্র দিয়েছেন করম আলী নামের আরেক নিবাসী। এতে ১৫ জনের নাম উল্লেখসহ প্রায় ৩০ জন ভুক্তভোগীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্তে সত্যতা পাওয়া গেলে এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন জেলা প্রশাসক। যদিও শান্ত মণ্ডল ও রিমন মণ্ডল এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
গত বুধবার ওই আশ্রয়ণ প্রকল্প ঘুরে নানা অসংগতির তথ্য পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানকালে জানা গেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২২ সালের দিকে খাসজমিতে ১২৫টির বেশি ঘর নির্মাণ করা হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর অনেকেই সেখানকার বরাদ্দ ঘরে ছেড়ে যান। নতুন করে উঠেছেন অনেকে। সেখানেই শুরু বিপত্তি।

জেলা প্রশাসকের কাছে অভিযোগ দানকারী কয়েকজন জানান, নতুন করে ঘরে উঠতে হরিশংকরপুর ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক সভাপতি রিমন মণ্ডল ও তাঁর ভাই শান্ত মণ্ডলকে তাদের কাউকে দিতে হয়েছে ১১ হাজার টাকা, কাউকে চার হাজার, কাউকে ১৬ হাজার। এমনকি কেউ মাত্র দুই হাজার টাকা দিয়েও ঘর বরাদ্দ পেয়েছেন। পাশাপাশি ওই ব্যক্তিরা আশ্রয়ণের পুরোনো বাসিন্দাদের ঋণ ও টিন দেওয়া এবং ভ্যান কিনে দেওয়ার নামেও বিভিন্ন অঙ্কের টাকা নিয়েছেন।
নতুন করে আশ্রয়ণের ঘরে ওঠা আলেয়া বেগমের ভাষ্য, অসহায় মাকে নিয়ে অনেক জায়গায় ঘুরেছেন। কেউ ঘর দেয়নি। পরে রিমনকে চার হাজার টাকা দিয়ে এই ঘরটা পেয়েছেন। টাকা না দিলে ঘর পাওয়া যায় না। তাই সরকারি ঘর হলেও টাকা দিতে হয়েছে তাঁকে।
অভিযোগপত্রে সই দেওয়া করম আলী পেশায় দিনমজুর। তিনি বলেন, ৫ আগস্টের আগে স্থানীয়ভাবে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ১১ সদস্যের কমিটি হয়। এতে সভাপতি ছিলেন শান্ত মণ্ডল। অভ্যুত্থানের পর অন্যরা চলে গেলেও শান্ত মণ্ডলই সভাপতি থেকে গেছেন। এরপর থেকে শান্ত ও রিমন– দুই ভাই মিলে অসহায় বাসিন্দাদের কাছ থেকে নানা অজুহাতে টাকা নিতে থাকেন। বাধা দিতে গেলেই তারা ভয়ভীতি দেখান, দলের প্রভাব খাটান। বাধ্য হয়েই তারা প্রশাসনের কাছে অভিযোগ দিয়েছেন।

নিবাসী ভানু বেগমের অভিযোগ, গত রোজার ঈদের আগে ১৫ হাজার টাকা ঋণ দেওয়ার কথা বলে দুই হাজার টাকার সঙ্গে আইডি কার্ডের ফটোকপি ও এক কপি ছবি নিয়ে যান রিমন। তিনি সেই ঋণও পাননি। টাকাও ফেরত পাননি।
শান্ত মণ্ডল নিজেই আশ্রয়ণের পাইকপাড়া মৌজার ১৪, ১৫ ও ১৬ নম্বর ঘর দখলে রেখেছেন। ১৪ নম্বর ঘরে কোনো বাসিন্দা না থাকায় এর কোনায় মুদি দোকানের সঙ্গে চায়ের দোকান তৈরি করেছেন। সেই দোকান দেখাশোনা করতে কর্মচারী রেখেছেন সাহেব আলী নামের একজনকে। শান্তর নামে বরাদ্দ ঘরে থাকেন তিনি। বুধবার সেই ঘরের দরজা খুলে দিতেই কাঠের টেবিলের ওপর বড় দুটি ধারালো রামদা দেখা যায়। পাশের কক্ষে বড় আকৃতির তিনটি তেলের পাত্র দেখা যায়। কিছুক্ষণ পরই শান্তর ফুপু শাহিদার জন্য বরাদ্দ (১৬ নম্বর) ঘর থেকে দোকান কর্মচারী সাহেব আলী ও একটি ছেলে কয়েকটি প্যাকেটে করে কিছু নিয়ে পাশের ধানক্ষেত দিয়ে দ্রুত সটকে পড়েন।

আশ্রয়ণ প্রকল্পের সভাপতি শান্ত মণ্ডলের ভাষ্য, ‘৫ তারিখের পরে তিনজনকে ঘরে উঠাইছি। তাদের কাছ থেকে কোনো টাকা নিইনি। কিছু তেলের পাত্র বাড়ি থেকে এনে রেখেছি।’
ঘরে থাকা রামদার বিষয়ে কিছুই জানেন না বলেও দাবি করেন শান্ত মণ্ডল। তাঁর কর্মচারী সাহেব আলীর ভাষ্য, ‘আমি এই দা দিয়ে সবজি কাটি।’
এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন হরিশংকরপুর ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক সভাপতি রিমন মণ্ডল। তিনি বলেন, ‘সামাজিক কোন্দলে বিপক্ষ গ্রুপ এই বদনাম ছড়াচ্ছে। আমি কোনো টাকা নিইনি। বরং বিভিন্ন সময় আশ্রয়ণের মানুষকে সহযোগিতা করি। ৫ তারিখের পরে দুই থেকে পাঁচজন লোক এসেছে। আমি তাদের ঘর নিয়ে দিয়েছি ফ্রি। হয়তো
অনেকে বলছে, জোর করেছে– ভাই এক হাজার টাকা দিলাম, মিষ্টি খাইয়েন। এটা নিয়েই এসব করতেছে।’ তবে তাঁর বিপক্ষ গ্রুপে কারা রয়েছেন, তা বলেননি তিনি।
ঝিনাইদহ সদর থানা যুবদলের সভাপতি আশরাফুল ইসলাম আশরাফ এ বিষয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সমকালকে বলেন, ‘আমার জানামতে রিমন মণ্ডল কোনো চাঁদাবাজিতে যুক্ত নন। তিনি ষড়যন্ত্রের শিকার। আমি বিষয়টি আগেও খতিয়ে দেখেছি, আরও খতিয়ে দেখছি।’
এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আওয়াল। তিনি বলেন, বিষয়টি শতভাগ দেখা হবে। বিধিসম্মতভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রশাসনিক শক্ত হাত অল্প সময়েই দেখতে পাবেন।

Facebook
X
LinkedIn
Telegram
WhatsApp
Email