ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি রাজধানীর বিজয়নগরে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর বিজয়নগরের বক্স কালভার্ট এলাকায় তাকে গুলি করা হয়। বর্তমানে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে ফেসবুকে ‘দশেরলাঠি – Dosherlathi’ নামের একটি পেজ থেকে চারটি ভিন্ন গণমাধ্যমের আদলে তৈরি আলাদা ফটোকার্ডের মাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছে যে, হাদির ওপর হামলার ঘটনায় শিবির জড়িত।

কালবেলার আদলে তৈরি একটি ফটোকার্ডে দাবি করা হয়েছে, ‘ওসমান হাদির উপরে হামলায় জামায়াত শিবির জড়িত।’
বাংলাদেশ টাইমসের আদলে তৈরি একটি ফটোকার্ডে দাবি করা হয়েছে, ওসমান হাদির উপরে গুলি জামায়াত ‘শিশির’ করতে পারে জানিয়েছে ডিএমপি।
‘দ্যা ঢাকা ডায়েরি’র আদলে তৈরি একটি ফটোকার্ডে দাবি করা হয়েছে, ওসমান হাদির ওপর হামলার হুকুমদাতা ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম। তারেক রহমানের দেশে আসা ঠেকাতে ওসমান হাদির উপরে গুলির নির্দেশ দিয়েছেন।
আরটিভির আদলে তৈরি একটি ফটোকার্ডে দাবি করা হয়েছে, “ওসমান হাদির উপর গুলি বর্ষণ কারি জামায়াত – শিবিরের রাজনীতির সাথে জড়িত : ডিএমপি কমিশনার।” একই দাবিতে সমাবেশে বক্তব্য দিয়েছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী। দেখুন এখানে।
এই চার ফটোকার্ডে এই প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত সম্মিলিতভাবে রিয়েক্ট পড়েছে ৬৬ হাজারের বেশি। ১৩ হাজারের বেশি বার পোস্টগুলো শেয়ার করা হয়েছে।
ফ্যাক্টচেক
রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় কালবেলা, বাংলাদেশ টাইম, দ্যা ঢাকা ডায়েরি ও আরটিভি এমন কোনো ফটোকার্ড প্রকাশ করেনি। প্রকৃতপক্ষে, গণমাধ্যমগুলোর ফটোকার্ড ডিজাইন প্রযুক্তির সহায়তায় নকল করে আলোচিত দাবি সংবলিত ফটোকার্ডগুলো তৈরি করা হয়েছে।
আলোচিত দাবিতে প্রচারিত ফটোকার্ডগুলো পৃথকভাবে যাচাই করেছে রিউমর স্ক্যানার।
কালবেলার ফটোকার্ড যাচাই
এ বিষয়ে অনুসন্ধানে আলোচিত ফটোকার্ডটি পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, এতে কালবেলার লোগো এবং ফটোকার্ডটি প্রচারের তারিখ হিসেবে ১২ ডিসেম্বর, ২০২৫ উল্লেখ রয়েছে। এর সূত্র ধরে কালবেলার ফেসবুক পেজে প্রচারিত ফটোকার্ডগুলো পর্যবেক্ষণ করে উক্ত শিরোনাম সম্বলিত কোনো ফটোকার্ড খুঁজে পাওয়া যায়নি। এছাড়াও কালবেলার ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো গণমাধ্যমেও উক্ত দাবির বিষয়ে কোনো সংবাদ খুঁজে পাওয়া যায়নি।
তবে, গত ১২ ডিসেম্বর কালবেলার ফেসবুক পেজে প্রচারিত একটি ফটোকার্ড খুঁজে পাওয়া যায়। ফটোকার্ডটি পর্যালোচনা করে আলোচিত দাবিতে প্রচারিত ফটোকার্ডের ছবি ও গ্রাফিক্যাল ডিজাইনের সাথে এর সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। তবে এই ফটোকার্ডটিতে ‘ওসমান হাদির সর্বশেষ অবস্থা জানালেন চিকিৎসক’ শীর্ষক বাক্য রয়েছে, যা আলোচিত ফটোকার্ডে পরিবর্তন করে ‘ওসমান হাদির উপরে হামলায় জামায়াত শিবির জড়িত’ শীর্ষক বাক্য লেখা হয়েছে।

অর্থাৎ, কালবেলার এই ফটোকার্ডটি সম্পাদনা করেই আলোচিত ফটোকার্ডটি তৈরি করা হয়েছে।
মূল ফটোকার্ড সংবলিত পোস্টটির কমেন্টে পাওয়া এ সংক্রান্ত সংবাদ প্রতিবেদনে হাদির চিকিৎসার বিষয়ে ঢামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের আবাসিক সার্জন ডা. মোস্তাক আহমেদের বক্তব্য রয়েছে। একই প্রতিবেদনে ডিএমপির উপকমিশনার (ডিসি) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান ও ওসমান হাদিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে আসা মিসবাহ নামে এক ব্যক্তির বক্তব্যও পাওয়া যায়। তবে এই প্রতিবেদন এবং অন্যান্য গণমাধ্যম সূত্রে আলোচিত দাবিটির বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ টাইমসের ফটোকার্ড যাচাই
আলোচিত ফটোকার্ডে থাকা বাংলাদেশ টাইমসের লোগো ও প্রকাশের তারিখের (১২ ডিসেম্বর) সূত্র ধরে গণমাধ্যমটির ফেসবুক পেজ, ওয়েবসাইট ও ইউটিউব চ্যানেলে পর্যবেক্ষণ করে এমন কোনো ফটোকার্ড বা সংবাদ খুঁজে পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশ টাইমস ১২ ডিসেম্বর এই ডিজাইনে (ব্যক্তির ছবির উপরের অংশে নিজেদের লোগো ও তারিখ) কোনো ফটোকার্ড প্রকাশ করেনি। তাছাড়া, অন্যান্য গণমাধ্যমের মতো বাংলাদেশ টাইমসও স্পর্শকাতর শব্দগুলো (গুলি, গ্রেপ্তার) সরাসরি না লিখে হাইফেন ব্যবহার করে। কিন্তু প্রচারিত ফটোকার্ডে এমন শব্দ সরাসরি লেখা রয়েছে।

অনুসন্ধানে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) পক্ষ থেকে এমন কোনো তথ্য দেওয়া হয়েছে কিনা তা জানতে এ সংক্রান্ত গণমাধ্যমের সংবাদগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এই ঘটনায় হামলাকারীদের শনাক্তের কথা ডিএমপির পক্ষ থেকে জানানো হলেও তাদের দলীয় পরিচয় বা নাম এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত প্রকাশ করা হয়নি৷
দ্যা ঢাকা ডায়েরির ফটোকার্ড যাচাই
আলোচিত ফটোকার্ডে থাকা দ্যা ঢাকা ডায়েরির লোগো ও প্রকাশের তারিখের সূত্র ধরে গণমাধ্যমটির ফেসবুক পেজে প্রচারিত ফটোকার্ডগুলো পর্যালোচনা করে উক্ত শিরোনাম সংবলিত কোনো ফটোকার্ড খুঁজে পাওয়া যায়নি। দ্যা ঢাকা ডায়েরির ওয়েবসাইটেও আলোচিত দাবি সমর্থিত কোনো সংবাদ খুঁজে পাওয়া যায়নি।
তবে, ১২ ডিসেম্বর দ্যা ঢাকা ডায়েরির ফেসবুক পেজে প্রচারিত একটি ফটোকার্ড খুঁজে পাওয়া যায়। ফটোকার্ডটি পর্যালোচনা করে আলোচিত দাবিতে প্রচারিত ফটোকার্ডের ছবি ও গ্রাফিক্যাল ডিজাইনের সাথে এর সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। তবে এই ফটোকার্ডটিতে সাদিক কায়েমের বরাত দিয়ে ‘ওসমান হাদীকে গুলি করা হল। চাঁদাবাজ ও গ্যাংস্টারদের কবল থেকে ঢাকা সিটিকে মুক্ত করতে অচিরেই আমাদের অভ্যুত্থান শুরু হবে। রাজধানীর ছাত্র-জনতাকে প্রস্তুত থাকার আহবান জানাচ্ছি।’ শীর্ষক বাক্য রয়েছে, যা আলোচিত ফটোকার্ডে পরিবর্তন করে ‘ব্রেকিং নিউজ এই মাত্র পাওয়া খবর ওসমান হাদির ওপর হামলার হুকুমদাতা ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম। তারেক রহমানের দেশে আসা ঠেকাতে ওসমান হাদির উপরে গুলির নির্দেশ দিয়েছেন।’ শীর্ষক বাক্য লেখা হয়েছে।

ফটোকার্ডটি পর্যবেক্ষণ করে এর শিরোনামে ব্যবহৃত ফন্টের সাথে দ্যা ঢাকা ডায়েরির প্রচলিত ফটোকার্ডের শিরোনামে ব্যবহৃত ফন্টের অমিল পরিলক্ষিত হয়।
আরটিভির ফটোকার্ড যাচাই
এ বিষয়ে অনুসন্ধানে আলোচিত ফটোকার্ডটি পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, এতে আরটিভির লোগো এবং ফটোকার্ডটি প্রচারের তারিখ হিসেবে ১৩ ডিসেম্বর, ২০২৫ উল্লেখ রয়েছে। এর সূত্র ধরে আরটিভির ফেসবুক পেজে প্রচারিত ফটোকার্ডগুলো পর্যবেক্ষণ করে উক্ত শিরোনাম সম্বলিত কোনো ফটোকার্ড খুঁজে পাওয়া যায়নি। এছাড়াও আরটিভির ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো গণমাধ্যমেও উক্ত দাবির বিষয়ে কোনো সংবাদ খুঁজে পাওয়া যায়নি।
তবে, গত ১৩ ডিসেম্বর আরটিভির ফেসবুক পেজে প্রচারিত একটি ফটোকার্ড খুঁজে পাওয়া যায়। ফটোকার্ডটি পর্যালোচনা করে আলোচিত দাবিতে প্রচারিত ফটোকার্ডের ছবি ও গ্রাফিক্যাল ডিজাইনের সাথে এর সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। তবে এই ফটোকার্ডটিতে ‘হাদিকে গুলি করা ব্যক্তিদের শনাক্ত করে ফেলেছে পুলিশ: ডিএমপি কমিশনার’ শীর্ষক বাক্য রয়েছে, যা আলোচিত ফটোকার্ডে পরিবর্তন করে ‘ওসমান হাদির উপর গুলি বর্ষণ কারি জামায়াত – শিবিরের রাজনীতির সাথে জড়িত : ডিএমপি কমিশনার’ শীর্ষক বাক্য লেখা হয়েছে।

অর্থাৎ, আরটিভির এই ফটোকার্ডটি সম্পাদনা করেই আলোচিত ফটোকার্ডটি তৈরি করা হয়েছে।
মূল ফটোকার্ড সংবলিত পোস্টটির কমেন্টে পাওয়া এ সংক্রান্ত সংবাদ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ওসমান হাদিকে গুলি করা ব্যক্তিদের শনাক্ত করেছে পুলিশ। যেকোনও সময় তাদের গ্রেপ্তার করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী। তবে প্রতিবেদনে তাদের দলীয় পরিচয় বা নামের বিষয়ে কোনো তথ্য উল্লেখ পাওয়া যায়নি।
অর্থাৎ, চারটি ভিন্ন গণমাধ্যমের নামে ভুয়া ফটোকার্ডগুলো বানিয়ে অপপ্রচার চালানো হয়েছে।
‘দশেরলাঠি – Dosherlathi’ নামের ফেসবুক পেজটি ২০২৩ সালের ২০ এপ্রিল এই নামেই চালু হয়। এরপর আর নাম পরিবর্তন হয়নি।

সুতরাং, ওসমান হাদিকে নিয়ে ‘দশেরলাঠি – Dosherlathi’ নামের ফেসবুক পেজ থেকে শিবিরকে জড়িয়ে প্রচারিত ফটোকার্ডগুলো ভুয়া ও বানোয়াট।
