চরফ্যাশন উপজেলার দক্ষিণ আইচা থানার বাবুরহাট লঞ্চঘাটসংলগ্ন নদী থেকে অবৈধভাবে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের ফলে ভয়ংকর রূপ নিয়েছে তেঁতুলিয়া। ফলে নদী তীরবর্তী প্রতিরক্ষা বাঁধ ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
এতে উপজেলার বেশ কয়েকটি পয়েন্টে দেখা দিয়েছে তীব্র ভাঙন। পাশাপাশি কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত নদী রক্ষা বাঁধ বিলীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তাই আতঙ্কে দিন কাটছে নজরুলনগর ও বিচ্ছিন্ন মুজিবনগর ইউনিয়নের দুই পারের লক্ষাধিক মানুষের।
ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে মসজিদ, দোকানপাট, মাছঘাটসহ শতাধিক স্থাপনা। বালু উত্তোলন বন্ধ ও ভাঙন রোধে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তবে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে অভিযান চলমান আছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা প্রশাসন।
বুধবার (১১ মার্চ) সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, নজরুলনগর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাবুরহাট লঞ্চঘাট সংলগ্ন তেঁতুলিয়া নদীর বুক চিরে দিনের আলোতেই চলছে অবৈধ বালু উত্তোলন। অন্তত ৭ থেকে ৮টি বিশালাকার ড্রেজার জাহাজ দিয়ে প্রতিনিয়ত নদীর তলদেশ থেকে বালু তোলা হচ্ছে। এই বালু ১০ থেকে ১২টি জাহাজে করে নিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে বিভিন্ন এলাকায়।
এতে নদীর তলদেশে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হচ্ছে এবং নদী শাসনের জন্য ফেলা কংক্রিট ব্লকগুলো ধীরে ধীরে নদীগর্ভে তলিয়ে যাচ্ছে। শান্ত তেঁতুলিযা নদী এখন হয়ে পড়েছে অশান্ত। এতে ভয়াবহ ভাঙনে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে বহু মানুষের ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, দোকানপাটসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।
বাবুরহাট ঘাটের মুদি ব্যবসায়ী রিযাজ ,সমাজকর্মী জাহিদ সহ একাধিক ব্যক্তি জানান, নজরুলনগর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসানের নেতৃত্বে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে এই অবৈধ বালু উত্তোলন কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ড্রেজার চালক জানান, প্রতিটি ড্রেজার জাহাজ থেকে প্রতিদিন প্রায় ৫ হাজার টাকা করে ‘মাসোহারা’ দিতে হয়। সে হিসাবে প্রতিদিন প্রায় ৪০ হাজার টাকা এবং মাসে প্রায় ১২ লাখ টাকার অবৈধ লেনদেন এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, এই সিন্ডিকেটের অন্যতম সহযোগী মাহমুদুল হাসানের বড় ভাই এবং স্থানীয় ১ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য জাহিদুল শিকদার। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি হিসেবে তার প্রভাব কাজে লাগিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। একই ইউনিয়নের যুবদল নেতা রুবেল শিকদার ও তানজিবসহ আরও দুজন এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে সম্পৃক্ত আছে বলে জানা গেছে।
এদিকে বাবুরহাট লঞ্চঘাট সংলগ্ন নদী রক্ষা বাঁধ এখন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে রয়েছে। স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তি আনিসুর রহমান জুলফিকার বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে নদী শাসনের জন্য ফেলা বড় বড় ব্লকগুলো ধীরে ধীরে নদীর গভীরে তলিয়ে যাচ্ছে। এতে করে আমাদের বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় মৎস্য ব্যবসায়ী হাসান মুন্সি বলেন, নদীর লগে যুদ্ধ করে এতদিন টিকে আছি। নদী থেকে বালু তোলার ফলে নদীর তলদেশে বড় বড় গর্ত হয়ে হঠাৎ নদী ভাঙা শুরু হয়েছে। থাকার শেষ আশ্রয়স্থলটুকু নদীতে বিলীন হয়ে যাবে। সামনে বর্ষা মৌসুমে নদী ভাঙন তীব্র হলে নজরুলনগর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে নজরুলনগর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান মুঠোফোনে বলেন, বালি উত্তোলনের সঙ্গে আমি জড়িত নই। ইতোমধ্যে আমি বালি উত্তোলনের বিরুদ্ধে কথা বলেছি। আমি নিজেই জানি না কারা আসলে বালি উত্তোলন করছে।
এ বিষয়ে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এমাদুল হক বলেন, বাবুরহাট সংলগ্ন তেঁতুলিয়া নদী থেকে বালি উত্তোলনের বিষয়টি আমি জেনেছি। যারা অবৈধভাবে বালি উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
