চাঁদার পর এবার ‘ভাড়া’ নিয়ে সড়কমন্ত্রীর জনগণের সাথে বেপরোয়া তামাশা

পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে গত বছরের তুলনায় এবার গণপরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের মহোৎসব চলছে। তবে সাধারণ মানুষের এই চরম ভোগান্তিকে ছাপিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের সাম্প্রতিক কিছু উদ্ভট ও বিতর্কিত মন্তব্য।

বাসে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের পাহাড়সম অভিযোগের বিপরীতে মন্ত্রীর ‘উল্টো সুর’ এবং যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্যকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়াকে ‘জনগণের সাথে তামাশা’ হিসেবে দেখছেন সাধারণ যাত্রী ও নেটিজেনরা। বর্তমান জনদুর্ভোগের বিপরীতে তাঁর বিতর্কিত অবস্থানে তারা ক্ষোভ উগড়ে দিচ্ছেন।

২০২৬ সালের এই ঈদযাত্রায় সড়ক ও রেল—উভয় পথেই যে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে, তা বিগত কয়েক বছরের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে বলে দাবি করছেন ভুক্তভোগীরা।

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের সাম্প্রতিক এই বিতর্কিত কর্মকাণ্ড এবং উদ্ভট মন্তব্যে কেবল সাধারণ মানুষই নন, বরং খোদ বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যেও গভীর ক্ষোভ ও অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে প্রতিক্রিয়ায় দলটির কর্মীদের এই মানসিক অবস্থা প্রতিফলিত হচ্ছে।

“ভাড়া বাড়ছে না, বরং কমছে” – মন্ত্রীর আজব দাবি

সম্প্রতি রাজধানীর গাবতলী ও মহাখালী বাস টার্মিনাল পরিদর্শনকালে সেতুমন্ত্রী দাবি করেন, ঈদে যাত্রীদের কাছ থেকে কোনো বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে না। বরং কিছু ক্ষেত্রে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে ২০-৩০ টাকা কম নেওয়া হচ্ছে। মন্ত্রীর এমন মন্তব্যে হতবাক গাবতলীতে অপেক্ষমাণ যাত্রীরা। এক ক্ষুব্ধ যাত্রী বলেন: “মন্ত্রী মহোদয় কোন গ্রহে বাস করেন জানি না। ৫৫০ টাকার টিকিট ১০০০ টাকায় কিনতে হয়েছে, আর উনি বলছেন ভাড়া কম রাখা হচ্ছে! এটা আমাদের জখমে নুনের ছিটা দেওয়ার মতো তামাশা।”

বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) দুপুরে রাজধানীর মহাখালী বাস টার্মিনাল পরিদর্শনে গিয়ে সাংবাদিকদের মন্ত্রী বলেন, ‘সাধারণত চার্টের চেয়ে কম ভাড়ায় বাসস্টপেজ থেকে যাত্রীরা গিয়ে অভ্যস্ত। যখনই চাপ থাকে না তখন চার্টের চেয়েও কম ভাড়ায় বাস মালিকরা যাত্রী নেন। এখন চার্টের নির্ধারণ ভাড়াটাই নেওয়া হচ্ছে। যেসব যাত্রী কম ভাড়ায় যেত বা গিয়ে অভ্যস্ত তাদের কাছে মনে হচ্ছে ভাড়া বেশি নিচ্ছেন মালিকরা।’

শুধু তাই নয়, মাঝপথের যাত্রীদের কাছ থেকে গন্তব্যস্থলের পুরো ভাড়া আদায় করাকেও ‘যৌক্তিক’ বলে ব্যাখ্যা করেছেন মন্ত্রী। তার মতে, বাসের ভাড়া নির্ধারিত হয় পূর্ণ রুটের ব্যয়ের ওপর ভিত্তি করে। এই যুক্তিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নেটিজেনরা ‘লুটপাটের সরকারি বৈধতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

এর আগে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই পরিবহন খাতে পদ্ধতিগত চাঁদাবাজি নিয়ে মন্ত্রীর বিতর্কিত বক্তব্য জনতার ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢালে। তিনি দাবি করেন, সড়ক বা টার্মিনালে যা ঘটছে তা চাঁদাবাজি নয়, বরং ‘সংগঠন পরিচালনা ব্যয়’। মন্ত্রীর এই নতুন সংজ্ঞায়নের পর ফেসবুক ও এক্স-এ সমালোচনার ঝড় ওঠে। অন্যদিকে, রবিউল আলমের এসব লাগামহীন জনবিরোধী কর্মকাণ্ড দলের সুনামকে চরমভাবে ক্ষুন্ন করছে বলে মনে করেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা।

একজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, “মন্ত্রী মহোদয় চমৎকার শব্দ শিখিয়ে দিলেন। এখন থেকে পকেটমার ধরা পড়লে বলবে এটা পকেটমারি নয়, ব্যক্তিগত পরিচালনা ব্যয়!”

রেলপথেও হাহাকার: ‘সার্ভার ডাউন’ ও ব্ল্যাক টিকিটের রাজত্ব

সড়কের মতো রেলযাত্রাতেও চলছে চরম অব্যবস্থাপনা। অনলাইন সার্ভার শক্তিশালী করার ঘোষণা দিলেও টিকিট ছাড়ার ৫ মিনিটের মধ্যেই সাইট অচল হয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ। উত্তরবঙ্গগামী ট্রেনগুলো ৫ থেকে ১০ ঘণ্টা বিলম্বে ছাড়ছে, যাকে মন্ত্রী ‘নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া’ বলে চালিয়ে দিচ্ছেন।ট্রেনের ছাদে ও ভেতরে তিল ধারণের জায়গা নেই। এসির বগিতেও দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীদের ভিড়ে টিকিটধারী যাত্রীরা নিজেদের সিটে পৌঁছাতে পারছেন না।

বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা দেখে সাধারণ মানুষ ও নেটিজেনরা বারবার সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কার সুশৃঙ্খল ব্যবস্থার কথা স্মরণ করছেন। সেই সময়ে কেবল দৃঢ় সুশাসন ও সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশের বিদ্যমান বাস ও ট্রেন ব্যবস্থাপনায় যে শৃঙ্খলা ফিরে এসেছিল, তা সর্বমহলে প্রশংসা কুড়িয়েছিল। বিশ্লেষকরা বলছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে এনআইডি যাচাইয়ের মাধ্যমে টিকিট নিশ্চিত করায় কালোবাজারি বন্ধ হয়েছিল।রাস্তায় চাঁদাবাজি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করায় ভাড়ার নৈরাজ্য ছিল না। ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল।

আজকের বিশৃঙ্খলার বিপরীতে নেটিজেনদের প্রশ্ন—”অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় যদি সুশাসন সম্ভব হয়, তবে এখন কেন এই হরিলুট? মন্ত্রীকেই এর জবাব দিতে হবে।”

এদিকে, মন্ত্রণালয় থেকে রুট পারমিট বাতিল ও জেল-জরিমানার হুমকি দেওয়া হলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ সামান্যই। টিকিট কালোবাজারি এবং কাউন্টারের বাইরে থেকে বাড়তি দামে টিকিট বিক্রির যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তার সাথে মন্ত্রীর ‘স্বস্তিদায়ক ঈদযাত্রা’র বর্ণনার কোনো মিল নেই।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জনগণ এখন চটকদার মন্তব্য বা বিতর্কিত যুক্তি নয়, বরং সড়ক ও রেলপথে প্রকৃত শৃঙ্খলা এবং ভাড়ার নৈরাজ্য বন্ধে প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা দেখতে চায়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিএনপি’র তৃণমূলের নেতাকর্মীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, “আমরা দীর্ঘ ১৭ বছর রাজপথে জেল-জুলুম সহ্য করে দলটিকে ক্ষমতায় এনেছি। এখন যখন সময় হয়েছে মানুষের সেবা করার, তখন নির্মাণ ব্যবসায়ীর ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে আসা একজন মন্ত্রী জনগণের সাথে তামাশা করছেন। তৃণমূলের কর্মীরা যখন সাধারণ মানুষের গালি শুনছে, তখন মন্ত্রী মহোদয় এসি রুমে বসে চাঁদাবাজিকে ‘পরিচালনা ব্যয়’ বলে জায়েজ করছেন। এই দম্ভ দলের শত বছরের ত্যাগের ইতিহাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।”

ইঞ্জিনিয়ার আবিদ হাকিম নামে একজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, “নির্মাণ ব্যবসা আর রাষ্ট্র পরিচালনা যে এক নয়, সেটা হাড়হারে টের পাচ্ছে দেশের মানুষ। নিজের পাহাড়সম ব্যর্থতা স্বীকার না করে উল্টো ‘ভাড়া কম রাখা হচ্ছে’ বলে তামাশা করা জনগণের সাথে চরম প্রতারণা। নিজের ব্যক্তিগত ব্যবসায় লাভ-ক্ষতি বুঝলেও সাধারণ মানুষের পকেট কাটার ব্যথা মন্ত্রী কেন বুঝছেন না? আপনার এই লাগামহীন মন্তব্য আর ফাঁপা বুলি দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য যথেষ্ট।”

সৌরভ লিখেছেন, “রাস্তায় যখন মানুষ ভাড়ার নৈরাজ্যে দিশেহারা, স্টেশনে যখন মানুষ ট্রেনের টিকিটের জন্য হাহাকার করছে, তখন মন্ত্রী মহোদয় ফিটফাট সুটেড-বুটেড হয়ে টার্মিনালে গিয়ে তামাশা করছেন। অথচ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সাধারণ পোশাক পরে মানুষের দোরগোড়ায় যাচ্ছেন, সমস্যার সমাধান করছেন—যা জনমনে আশার আলো জাগাচ্ছে। মন্ত্রীর উচিত দম্ভ ত্যাগ করে প্রধানমন্ত্রীর এই জনবান্ধব আদর্শ অনুসরণ করা নতুবা সরে দাঁড়ানো।”

ফাহমিদা আক্তার লিখেছেন, “চাঁদাবাজিকে ‘পরিচালনা ব্যয়’ বলে জায়েজ করার মাধ্যমে আপনি প্রমাণ করেছেন যে জনগণের চেয়ে আপনার কাছে গোষ্ঠীস্বার্থ বড়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যে সুশাসন ও শৃঙ্খলা দিয়ে প্রশংসা কুড়িয়েছিল, আপনার অদক্ষতায় তা এখন বিলীন হওয়ার পথে। অভিজ্ঞতাহীনতার দোহাই দিয়ে নিজের গদি না সামলে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিন, নতুবা এই অসন্তোষ আপনার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে।”

Facebook
X
LinkedIn
Telegram
WhatsApp
Email