নারায়ণগঞ্জ শহরে আবু হানিফ নামে এক যুবককে পিটিয়ে ও ইট দিয়ে থেঁতলে হত্যার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। মারধরে জড়িতরা মহানগর যুবদলের সদস্য সচিব শাহেদ আহমেদের অনুসারী বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। তবে শাহেদ আহমেদের দাবি, হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই। কখনও তারা যুবদলের সঙ্গে ছিলেন না।
আবু হানিফ বাগেরহাটের শরণখোলার আবুল কালামের ছেলে ও নারায়ণগঞ্জে একটি বাড়ির নৈশপ্রহরী ছিলেন। সংসারে স্ত্রী ও তিন সন্তান রয়েছে তাঁর।
গত ২০ অক্টোবর বিকেলে আবু হানিফকে হত্যা করা হয়। পরদিন তাঁর ছোট ভাই হযরত আলী সদর মডেল থানায় মামলা করেন। পুলিশ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তারা হলেন– কুমিল্লার মুরাদনগরের সায়েস্তারা গ্রামের মো. বাহার, তাঁর ভাই সাইদুল ইসলাম ও নারায়ণগঞ্জের মেট্রো হল এলাকার মুশফিকুর রহমান জিতু।
ওসি নাসির আহমেদ জানান, ভিডিও ফুটেজ দেখে হত্যাকাণ্ডে জড়িত তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছেন তারা। হোতা খানপুরের আজিম ভিলার মালিক বোকা ভূঁইয়ার ছেলে মো. অভিসহ বাকিদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
তিনি বলেন, আবু হানিফ যে বাড়ির নৈশপ্রহরী ছিলেন, সেখানকার এক ভাড়াটিয়া পোশাককর্মীর ১১ বছর বয়সী মেয়েকে একাধিকবার ধর্ষণের অভিযোগে ধরে এনে তাঁকে পিটিয়ে হত্যার তথ্য পেয়েছি আমরা। বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর একটি পার্কের সিসিটিভির ফুটেজ। এতে দেখা যায়, ৮-১০ জন লুঙ্গি-গেঞ্জি পরা আবু হানিফকে নিয়ে নগরীর খানপুরের জোড়া ট্যাঙ্কের নিচে খালি জায়গায় ঢুকছেন। কিছুক্ষণ পর তাঁকে পেটাতে থাকেন। এক পর্যায়ে সেখানে হানিফের বোনজামাইকে ধরে আনা হয়। ঘণ্টাখানেক পর হানিফকে নিয়ে বের হয়ে যান মারধরকারীরা।
পার্কের ভেতরে একটি দোকানের মালিক মোহাম্মদ মানিক বলেন, এলাকার কতিপয় যুবক হানিফকে এখানে এনে মারধর করতে থাকলে আমি বাধা দিই। তখন তারা হানিফকে নিয়ে চলে যায়। এখন ফেসবুকের ভিডিওতে দেখছি, ওই যুবকরা হানিফকে মেট্রো সিনেমা হলের পেছনে র্যামলি ব্রাদার্সের খালি জায়গায় নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করেছে।
ছড়িয়ে পড়া আরেক ভিডিওতে দেখা যায়, হানিফকে ৮-১০ জন ঘিরে ধরে মারধর করছে। ইট দিয়ে তাঁর হাত-পা, হাঁটুসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করা হচ্ছে। এক পর্যায়ে হানিফ নির্জীব হয়ে পড়েন। নাড়াচাড়া করে সাড়া দেন কিনা তা দেখার চেষ্টা করেন মারধরকারীরা। সাড়া না পেয়ে পরে হানিফকে নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যা হাসপাতালে ফেলে রেখে যান তারা। রাত ৯টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক শাহাদাত হোসেন হানিফকে মৃত ঘোষণা করেন।
ভিডিও দুটি দেখালে খানপুর মেট্রো হল ও খানপুর বড় মসজিদ এলাকার একাধিক ব্যক্তি মারধরে জড়িত হিসেবে অভি, জিতু, মেহেদী, সাকিব, সুমন, রাহাত, অপু ও তাদের সহযোগীদের শনাক্ত করেন। আগে তারা নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে জাতীয় পার্টির প্রয়াত সংসদ সদস্য এ কে এম নাসিম ওসমানের ছেলে আজমীর ওসমানের সহযোগী হলেও গত বছরের ৫ আগস্টের পর যুবদলে ভিড়েছেন। তারা খানপুর পানির ট্যাঙ্কের নিচে ‘আমাদের নারায়ণগঞ্জ’ নামে একটি সংগঠনের কার্যালয় খুলে নিয়মিত আড্ডা দেন।
এসব যুবক মহানগর যুবদলের সদস্য সচিব শাহেদ আহমেদের অনুসারী বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
নিহতের বোন রাবেয়া বেগমের বরাত দিয়ে তাঁর স্বামী মোহাম্মদ ইব্রাহিম জানান, ঘটনার দিন দুপুরে হানিফ বাসায় ঘুমিয়ে ছিলেন। এলাকার বখাটে অভির নেতৃত্বে এক দল যুবক এসে তাঁকে তুলে নিয়ে যায়।
বৃহস্পতিবার মোহাম্মদ ইব্রাহিম সমকালকে বলেন, স্ত্রী ফোন করে এলাকার কিছু ছেলে বাসায় ঝামেলা করছে– জানালে আমি দ্রুত বাসায় আসি। এক দল যুবক আমাকে খানপুর জোড়া ট্যাঙ্কের মাঠে নিয়ে যায়। সেখানে হানিফ ভাইকে বসা অবস্থায় পাই। এর পর ১০-১২ যুবক আমাদের দুজনকে মারধর করে। আমার লুঙ্গি খোলার চেষ্টা করলে কোনো রকম দৌড়ে রক্ষা পাই। তাদের মধ্যে আমি পাশের বাড়ির অভিকে চিনেছি।
তিনি বলেন, পরে শুনেছি, হানিফ ভাইকে তারা অটোরিকশায় অন্য জায়গায় নিয়ে যায়। অনেক খোঁজাখুঁজির পর আমরা হাসপাতালে লাশ পাই। পরদিন গ্রামের বাড়িতে জানাজা শেষে দাফন করা হয়েছে। আমরা হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।
