ছাত্রলীগ-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে বিতর্কে অর্ঘ্য, সাতক্ষীরায় ছাত্রদলের সদস্যসচিব পদ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ!

দীর্ঘদিন পর সাতক্ষীরা জেলা ছাত্রদলের নতুন কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হলেও ‘সদস্যসচিব’ পদকে ঘিরে দেখা দিয়েছে তীব্র বিতর্ক ও ক্ষোভ। নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সাবেক কর্মী এবং যুবলীগ-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে আলোচিত জে. এম. দুদায়েভ মাসুদ খান (অর্ঘ্য)-এর নাম এ পদে আলোচনায় আসায় সংগঠনের ভেতরে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে।

তৃণমূলের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, যিনি অতীতে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং নৌকার পক্ষে প্রকাশ্যে প্রচারণা চালিয়েছেন, তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদে আনা হলে তা দলীয় আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে।

দলীয় ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের শাসনামলে অর্ঘ্য ছাত্রলীগের বিভিন্ন নেতার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ছবি ও তথ্যে দেখা যায়, তিনি সাতক্ষীরা জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক পদপ্রত্যাশী সাকিব রেজা, সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের সিনিয়র সহসভাপতি কাজী সাদিক দ্বীপ এবং পৌর ১ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রলীগের সভাপতি মুনতাসির রহমান মুনসহ বিভিন্ন নেতার সঙ্গে একাধিক কর্মসূচি ও মোটরসাইকেল শোডাউনে অংশ নিয়েছেন।

এ ছাড়া জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আশিকের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে পৌর ৩ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রলীগের সভাপতি রাজিবুল ইসলাম রাজার সঙ্গেও তাঁর ঘনিষ্ঠতা নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদ, সংসদ ও পৌরসভা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন অর্ঘ্য। বিশেষ করে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলামের পক্ষে এবং পৌর নির্বাচনে নৌকার প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় অংশ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

আরও অভিযোগ রয়েছে, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা সাদিকের ঘনিষ্ঠ হিসেবে তিনি এলাকায় প্রভাব বিস্তার করতেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন ছবিও ছড়িয়েছে, যেখানে তাকে সাতক্ষীরা পৌর যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এস এম তুহিনুর রহমানের সঙ্গে যুবলীগের প্রতীকী পোশাকে দেখা যায়।

ছাত্রদলের একাধিক নেতাকর্মী এই সম্ভাব্য সিদ্ধান্তকে ‘আত্মঘাতী’ হিসেবে দেখছেন। জেলা ছাত্রদলের এক জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, “জুলাইয়ের আন্দোলনের সময় যখন ছাত্রলীগের নেতাদের নেতৃত্বে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা হচ্ছিল, তখন অর্ঘ্যকে সেই হামলাকারীদের সঙ্গে চলাফেরা করতে দেখা গেছে। এখন তাকে সদস্যসচিব করা হলে তা ত্যাগী কর্মীদের জন্য অপমানজনক হবে।”

আরেকজন ছাত্রনেতা বলেন, “গত ১৬ বছর আমরা মামলা-হামলায় জর্জরিত ছিলাম, আর তিনি তখন ছাত্রলীগ-যুবলীগের সঙ্গে সক্রিয় ছিলেন। এখন তাকে রাজবন্দী হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যা বিভ্রান্তিকর।”

এদিকে ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অর্ঘ্যের বিরুদ্ধে নতুন করে নানা অভিযোগও সামনে এসেছে। স্থানীয়দের দাবি, তিনি সদর থানা থেকে অস্ত্র ও মোটরসাইকেল লুট, আদালতসংলগ্ন সরকারি জমি দখল এবং বড় পরিসরের মৎস্য ঘের দখলের সঙ্গে জড়িত। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।

তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অর্ঘ্য। তাঁর দাবি, ছাত্রলীগের নেতাদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল কেবল সহপাঠী হিসেবে। তিনি বলেন, “আমরা একসঙ্গে পড়াশোনা করতাম, সেই কারণে চলাফেরা ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক মতাদর্শ সবসময় আলাদা ছিল। উল্টো তাদের সঙ্গে আমার দ্বন্দ্ব ছিল এবং আমি একাধিকবার হামলার শিকার হয়েছি।”

তিনি আরও দাবি করেন, তিনি ২০১২ সাল থেকেই ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনেও সম্পৃক্ত ছিলেন বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, “আমি জেলও খেটেছি। ২৪ জুলাই আমাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগেও কয়েকবার গ্রেপ্তার হয়ে জামিন পেয়েছি।”

পারিবারিক রাজনৈতিক পটভূমির কথাও উল্লেখ করেন অর্ঘ্য। তিনি বলেন, তাঁর বাবা খান এ মির্জা ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ২০০৬ সালে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হন। তাঁর মা-ও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে জানান তিনি।

যুবলীগ সংশ্লিষ্ট একটি ছবির বিষয়ে তিনি দাবি করেন, সেটি সম্পাদিত (এডিট করা)। আর আওয়ামী লীগ আমলের ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণের অভিযোগকেও ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’ বলে উড়িয়ে দেন তিনি।

এদিকে, সম্ভাব্য এই কমিটির খবরে তৃণমূল পর্যায়ে ক্ষোভ বাড়ছে। স্থানীয় ছাত্রদল নেতাকর্মীরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “দলে অনুপ্রবেশকারীদের জায়গা দেওয়া হলে তা মেনে নেওয়া হবে না।”

সাতক্ষীরায় ছাত্রদলের নতুন কমিটি ঘোষণার আগেই এ বিতর্ক সংগঠনের ভেতরে বিভাজনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Facebook
X
LinkedIn
Telegram
WhatsApp
Email