জমির বায়না দলিল হাতিয়ে দফারফার অভিযোগ বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে

রংপুর মেট্রোপলিটনের মাহিগঞ্জ থানার বড় দরগাহাট এলাকার এক ব্যক্তিকে টাকা তুলে দেওয়ার আশ্বাসে জিম্মি করে ১৮ লাখ ৫ হাজার টাকার জমির বায়না দলিল ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে।

এ ঘটনায় ভুক্তভোগী আলাল হোসেন (ড্রাইভার আলাল) বাদী হয়ে মাহিগঞ্জ থানায় একটি লিখিত অভিযোগ করেছেন।

অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা হলেন, পীরগাছা কল্যাণী ইউনিয়ন বিএনপির ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি সামছুল আলম, কল্যাণী ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক রাফিউল ইসলাম রনি, মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য তুহিন, কল্যাণী ইউনিয়ন যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক রুবেল রানা, কল্যাণী ইউনিয়ন ৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সুমন চৌধুরী, ৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সদস্য জুয়েল।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, রংপুর মেট্রোপলিটনের মাহিগঞ্জ বড় দরগাহাট-সংলগ্ন পূর্ব ফকিরা গ্রামের আলাল হোসেন কাউনিয়া গোড়াই এলাকার মৃত মন্টু মিয়ার ছেলে ফুল মিয়ার (৪১) মালিকানাধীন বড় দরগা বাজারের তিন শতক জমি বিক্রির উদ্দেশ্যে ১০০ টাকার তিনটি নন-জুডিসিয়াল স্ট্যাম্পে গত বছরের ২১ জুন বায়না দলিল করেন। যেখানে জমির মূল্য বাবদ ১৮ লাখ ৫ হাজার টাকা গ্রহণ করেন। বায়না দলিলের নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পর বাকি মূল্য পরিশোধ করার ইচ্ছা থাকলেও ভুক্তভোগী আলালকে দলিল না করে দিয়ে শতক-প্রতি অতিরিক্ত মূল্য দাবি করেন জমির মালিক ফুল মিয়া। একপর্যায়ে বায়নার ১৮ লাখ ৫ হাজার টাকা ফেরতের প্রতিশ্রুতি দেন ফুল মিয়া।

এদিকে আলালের টাকা ফেরত না দিয়ে ফুল মিয়া গোপনে জমি অন্য জায়গায় বিক্রির চেষ্টা করলে টাকা তোলার দায়িত্ব গ্রহণ করেন বিএনপি নেতা সামছুল আলম, ছাত্রদল নেতা রাফিউল ইসলাম রনি, যুবদল নেতা তুহিন।

গত ২ জুন রাত ১১টার দিকে মহানগরীর মাহিগঞ্জের নবদীগঞ্জ টেপামধুপুর আমতলা বাজারের পাবনাইয়াটারি থেকে আলালকে পাওনা অর্থ উদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে পাশের ফতা মুন্সিপাড়ার যুবদল নেতা রুবেলের বাড়িতে প্রবেশ করেন অভিযুক্ত নেতারা।

পরে নেতাকর্মীরা আলালকে আটকে রেখে হত্যাসহ অস্ত্র মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দিয়ে বায়না দলিল দাবি করেন এবং বায়নার ১৮ লাখ ৫ হাজার টাকার বদলে আট লাখ টাকার প্রস্তাব দিয়ে চা-নাশতার খরচ বাবদ আরও দুই লাখ কেটে ছয় লাখ টাকা দিতে জোরপূর্বক রাজি করান। পরে আলাল প্রাণভয়ে বায়না দলিল বিএনপি নেতা শামসুল আলমকে দিতে বলেন তার ভাগনে আইয়ুব আলীকে। এরপর শামসুল আলমকে দলিল দিয়ে আলালকে উদ্ধার করেন আইয়ুব আলী।

এ বিষয়ে ভুক্তভোগী আলাল হোসেন জানান, বড় দরগা বাজারের মনি মার্কেটে ফুল মিয়ার কাছে সাড়ে তিন শতক জমির বায়না বাবদ তিনি ১৮ লাখ ৫ হাজার টাকা দেন। পরে জমির দলিল করতে গেলে বিক্রেতা অতিরিক্ত ১০ লাখ টাকা দাবি করেন। এতে তিনি বায়নার টাকা ফেরত চান। গত মাসের ১৯ তারিখ জমির রেজিস্ট্রির খবর পেয়ে পীরগাছায় গিয়ে তা আটকে দেন।

তিনি বলেন, বিএনপি নেতা শামসুল, ছাত্রদল নেতা রনি ও যুবদল নেতা তুহিনসহ কয়েকজন আমার টাকা উদ্ধার করে দেওয়ার কথা বলে নবদীগঞ্জে রুবেলের বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে আমাকে অস্ত্র মামলায় ফাঁসানো, রোলার দিয়ে পিষে ফেলা ও চিকলির বিলে নিয়ে জবাই করার হুমকি দিয়ে আট লাখ টাকায় সমঝোতার স্বীকারোক্তি নেন এবং বায়না দলিল নিয়ে যান। পরে আমি সমঝোতা না মেনে দলিল ফেরত চাইলে তারা দেননি।

আলাল মিয়া আরও বলেন, শামসুল আমার বাড়িতে এসে ছয় লাখ টাকায় বিষয়টি মীমাংসার প্রস্তাব দেন এবং আমাকে বাজারে নিয়ে এক লাখ টাকা দিতে চান। আমি তা গ্রহণ করিনি। বর্তমানে অভিযুক্তদের হুমকির কারণে আমি আতঙ্কে রয়েছি এবং বাড়ি থেকে বের হতে পারছি না।

কেশবপুরে মাথায় কাফনের কাপড় বেঁধে ছাত্রলীগের মিছিল
অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাইলে ওয়ার্ড সভাপতি সামছুল আলম বলেন, ‘এই দলিলের লেনদেন নিয়ে যা কথা হচ্ছে, এসব বিষয়ে আমি আগে কিছুই জানতাম না। একদিন হুট করে রাত ২টায় আলাল ফোন দিয়ে নবদীগঞ্জে যেতে বলে। তার ভাগনের কাছে একটা স্ট্যাম্প আছে, সেটা নিয়ে যেতে বলে। নবদীগঞ্জে গিয়ে শুনি, টাকা লেনদেন আজ না, কাল হবে। আমানতের স্ট্যাম্প তাই দিইনি। শুনলাম ৮ লাখ টাকার কন্টাক্ট হয়েছে। স্ট্যাম্প নিয়ে চলে আসি। পরে বললাম, টাকা দিলে স্ট্যাম্প দেব, না দিলে না। আমি রিস্ক নেব না বলে স্ট্যাম্প ফেরত দিতে চাই, কিন্তু আলাল নেয়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি শুধু স্ট্যাম্পের জামিনদার ছিলাম।’

অভিযুক্ত কল্যাণী ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক রাফিউল ইসলাম রনি বলেন, ‘রুবেল ভাইয়ের বাসায় যেয়ে সেদিন আলাল নিজেই মিট করছে ব্যাপারটা। আমরা এই ব্যাপারে জানিও না। ওদের একটা দর-কষাকষি হইছে সম্ভবত ৮ বা সাড়ে ৮ লাখে। আলাল নিজেই বলছে যে আমি ৯ লাখ টাকা চাইছি। ওরা ৮ লাখ দিতে চাইছে। পরে সাড়ে ৮ লাখে সমঝোতা হইছে। পরে আলাল ওই টাকাটা মানি নিছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘৮ লাখ টাকা করার পরে একটা ওর খরচ হইছে। খরচ কী? বিগত দিনে ও হাওলাত নিছে অনেকের কাছেই। ৫০ হাজার টাকা নিছে একজনের কাছে, একজনের কাছে নিছে ১ লাখ, একজনের কাছে ২০ হাজারের মতো। নেওয়ার পর ওর ৮ লাখ টাকার থেকে ওর হাওলাতি ঋণ পরিশোধ করার পর দেখা যাচ্ছে ৬ লাখ টাকা থাকে। আমরা ৬ লাখ টাকা নেওয়ার জন্য কোনো জবরদস্তি করিনাই। আলাল যদি আমার বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ দিতে পারে, তাহলে আমরা মাথা ন্যাড়া করি ঘুরব।’

অভিযুক্ত মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য তুহিন বলেন, ‘বড় দারগা আমার শ্বশুরবাড়ি। রনি আমার দলের ছেলে। ও বলছিল মীমাংসা করে দিতে। আমি জাস্ট দুই পক্ষকে সমঝোতার জন্য বসাই দিছিলাম। তবে সমঝোতা হয়নি।’

এ বিষয়ে কথা বলতে অভিযুক্ত কল্যাণী ইউনিয়ন যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক রুবেল রানার বাড়িতে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। তার সঙ্গে যোগাযোগ করাও সম্ভব হয়নি।

পীরগাছা কল্যাণী ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘এই অভিযোগের ব্যাপারে আমি কিছু জানি না। আপনাদের মাধ্যমে যেহেতু জানলাম, আমরা যাচাই-বাছাই করে দেখব। যদি সত্যতা মেলে, তাহলে আমরা সাংগঠনিকভাবে যে কর্মীই ভুল করুক না কেন, তার বিরুদ্ধে আমরা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’

রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের মাহিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাইদুল ইসলাম বলেন, জমির বায়নাপত্র-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আলাল হোসেন নামে এক ব্যক্তি থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন। আমরা তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

Facebook
X
LinkedIn
Telegram
WhatsApp
Email