সংসদে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি তোলার একদিনের মাথায় ঝালকাঠি-১ আসনের বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম জামালের বিরুদ্ধে জামায়াতের প্রার্থী ড. ফয়জুল হককে ফোনে গালিগালাজ ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। মঙ্গলবার (২৩ জুন) দুই নেতার মধ্যে হওয়া একটি ফোনালাপকে কেন্দ্র করে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ওই কথোপকথনে ড. ফয়জুল হককে ‘শুয়ারের বাচ্চা’ বলে সম্বোধন করার অভিযোগও উঠেছে এমপি জামালের বিরুদ্ধে।
মঙ্গলবারের ওই ফোনালাপে রফিকুল ইসলাম জামাল ড. ফয়জুল হককে উদ্দেশ করে বলেন, ‘তোমার লেখার সীমা ছাড়িয়ে গেছে। তুমি চোর দেখায় কী বলছো?’ জবাবে ফয়জুল হক বলেন, ‘আমি তো ভোট চোরের কথা বলছি। এটা তো আর আপনার চুরি না, তাই না?’ এরপর এমপি জামাল প্রশ্ন করেন, ‘কে ভোট চুরি করছে?’
একপর্যায়ে আলোচনা আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তখন রফিকুল ইসলাম জামাল বলেন, ‘করতে করতে মাত্রার বাইরে চলে গেছো।’ জবাবে ফয়জুল হক বলেন, ‘শোনেন, এই ধরনের থ্রেড দিবেন না। এই ধরনের থ্রেড দিবেন না মামা। থ্রেড দিবেন না।’ পরে কথোপকথনের এক পর্যায়ে এমপি জামাল বলেন, ‘শুয়ারের বাচ্চা, তোর সাথে কথা বলবো না আমি।’ জবাবে ফয়জুল হক বলেন, ‘শুয়ারের বাচ্চা বললেন কেন মামা? আমি কি আপনার সঙ্গে অভদ্র আচরণ করেছি? আপনি আমাকে শুয়ারের বাচ্চা বললেন কেন?’
ফোনালাপের পর প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ঝালকাঠি-১ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ড. ফয়জুল হক বলেন, সংসদে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার দাবি উত্থাপনকারী রফিকুল ইসলাম জামাল সকাল থেকেই তার বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক ও প্রতিহিংসাপরায়ণ আচরণ শুরু করেছেন। তার দাবি, নির্বাচনে দাড়িপাল্লা প্রতীকের বিজয় ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং সেই আক্রোশ থেকেই তাকে বিভিন্নভাবে হুমকি ও গালিগালাজ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, সংসদে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার দাবি তোলা যেতে পারে, কিন্তু সেই দাবির সমালোচনা সহ্য করতে না পারা রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা ও ধৃষ্টতাপূর্ণ আচরণের পরিচয়।
ড. ফয়জুল হক বলেন, তিনি ভেসে আসা কোনো ব্যক্তি নন। দক্ষিণাঞ্চলের একটি সম্মানিত পরিবার থেকে উঠে এসেছেন এবং ঝালকাঠির কায়েদ সাহেব হুজুরের নাতি হিসেবে মানুষের ভালোবাসা ও সম্মান পেয়েছেন। একজন এমপি প্রার্থী হিসেবে আরেকজন এমপি প্রার্থীর সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করা উচিত, সেটি রফিকুল ইসলাম জামাল দেখাতে পারেননি বলেও অভিযোগ করেন তিনি। একই সঙ্গে নির্বাচনের পর জনগণের সঙ্গে একজন জনপ্রতিনিধির যে আচরণ করা উচিত, সেটিও তিনি প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হয়েছেন বলে মন্তব্য করেন।
তিনি দাবি করেন, রফিকুল ইসলাম জামালের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর থেকে তাকে উদ্দেশ করে আরও নানা আপত্তিকর মন্তব্য করা হয়েছে। সেখানে তাকে ‘মাদক কারবারি’, ‘মালয়েশিয়ায় আদম ব্যবসার নামে প্রতারণাকারী’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। এমনকি তাকে উদ্দেশ করে বলা হয়েছে, ‘তুই কাকে চোর-ডাকাত বলছিস, তুই এখন বুঝবি’, ‘তুই কায়েদ সাহেব হুজুরের বংশের সবচেয়ে খারাপ সন্তান’ এবং ‘তোর বাবা তোকে জন্ম দিয়েছে কি না, তা নিয়েও আমার সন্দেহ আছে’। এসব বক্তব্যকে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও মানহানিকর মন্তব্য হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
ড. ফয়জুল হক বলেন, জীবন-মরণ, সম্মান ও মর্যাদা আল্লাহর হাতে। রাজাপুর-কাঠালিয়ার মানুষ তাকে ভোট দিয়েছেন এবং দীর্ঘদিন ধরে তিনি ওই এলাকার মানুষের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত। তার দাবি, এলাকার কোনো মানুষ তার আচরণ নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করতে পারবেন না। অথচ তাকে ফোনে হুমকি দিয়ে বলা হয়েছে, তাকে ‘পেনাল্টি’ দিতে হবে এবং তাকে দেখে নেওয়া হবে। তিনি অভিযোগ করেন, ওই কথোপকথনে তাকে ‘শুয়ারের বাচ্চা’ বলেও গালি দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, একটি ঐতিহ্যবাহী পরিবারের সদস্য এবং একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে তিনি সম্মান পাওয়ার প্রত্যাশা করেন। কিন্তু শুধুমাত্র জামায়াতের রাজনীতি করা এবং দাড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করায় তাকে অপমান, হুমকি ও গালিগালাজের শিকার হতে হয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেন শুধু রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে তাকে এমন ভাষায় আক্রমণ করা হবে।
ড. ফয়জুল হক আরও বলেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে এবং সবাই দেশ গঠনের রাজনীতি করতে চায়। সেই বাস্তবতায় জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার দাবি এবং ভিন্নমত পোষণকারীদের প্রতি আক্রমণাত্মক আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন, কেউ জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার দাবি তুলতে পারেন, আবার অন্য কেউ তার বিরোধিতাও করতে পারেন। কিন্তু সে কারণে কাউকে গালিগালাজ বা হুমকি দেওয়া রাজনৈতিক শিষ্টাচারের মধ্যে পড়ে না।
তিনি দাবি করেন, জামায়াতে ইসলামীর আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এ কারণে দলটির প্রতি অবমাননাকর আচরণ বা সমর্থকদের হুমকি দেওয়া অনুচিত। তিনি বলেন, রাজনীতি তিনি নিজের আদর্শ অনুযায়ী করবেন, কারও নির্দেশ বা ব্যক্তিগত প্রভাবের অধীনে নয়।
ড. ফয়জুল হক অভিযোগ করেন, নির্বাচনের পর রাজাপুর-কাঠালিয়া এলাকায় তার সমর্থকদের বাড়িঘরে হামলা চালানো হয়েছে এবং এসব ঘটনার তথ্য সংরক্ষণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, মানুষকে মারধর, বাড়িঘর ভাঙচুর, চুরি-ডাকাতি কিংবা ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে কেউ দায় এড়াতে পারবে না। ফ্যাসিবাদী আচরণ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, একজন স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে তিনি স্বাধীনভাবে ব্যবসা, বাণিজ্য ও রাজনীতি করার অধিকার রাখেন এবং কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সেই অধিকার কেড়ে নিতে পারে না।
সবশেষে তিনি অন্তর্বর্তী সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, সাম্প্রতিক হুমকির ঘটনার পর তার বা তার পরিবারের কোনো ধরনের ক্ষতি হলে এর জন্য তিনি ঝালকাঠি-১ আসনের এমপি রফিকুল ইসলাম জামালকে দায়ী করে গেলেন। একই সঙ্গে দেশবাসীকে বিষয়টি সম্পর্কে সচেতন ও সজাগ থাকার আহ্বান জানান তিনি।
এর আগে সোমবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে ঝালকাঠি-১ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম জামাল বিরোধী দল জামায়াতের নাম উল্লেখ না করে তাদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি জানান। তিনি বলেন, “এই দলটি ১৯৭১ সালে এ দেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ছিল। আমি মহান সংসদে দাবি করব, তারা বাংলাদেশের রাজনীতি করতে পারবে না। তাদের রাজনীতিও ফ্যাসিস্টদের মতো নিষিদ্ধ করা হোক।”
বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, “আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, নামের পর ইসলাম থাকলেই ইসলাম হয় না। যারা ধর্মের নামে রাজনীতি করেন, গত নির্বাচনে ভোটের বিনিময়ে মানুষকে বেহেশত দিয়েছেন, আমরা দেখেছি, বিড়ির সুখ টানের মধ্য দিয়েও তারা বলেছিল, সব পাপ মওকুফ হওয়া যাবে। এভাবে একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে যারা ইসলামের নামে রাজনীতি করছে, আমি মহান সংসদে দাবি করব, তারা বাংলাদেশের রাজনীতি করতে পারবে না।”
উল্লেখ্য, ঝালকাঠি-১ আসনে জামায়াতের মনোনীত প্রার্থী ড. ফয়জুল হক একসময় বলেছিলেন, “বিড়িতে সুখ টানের মধ্যেও দাঁড়িপাল্লার দাওয়াত দিলে আল্লাহ মাফ করে দিতে পারেন।” ওই বক্তব্যের কারণে জামায়াতে ইসলামী তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছিল।
এদিকে একই দিনে জাতীয় সংসদে কুষ্টিয়া-১ আসনের শাসকদলীয় সংসদ সদস্য রেজা আহাম্মেদ দেশে মসজিদভিত্তিক রাজনীতি বন্ধের দাবি জানান। তিনি বলেন, “মসজিদ আল্লাহর ঘর। সেখানে মানুষ নামাজ পড়বে, কোরআন শরিফ পড়বে। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দল মসজিদে গিয়ে রাজনীতি করবে না। আমি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অনুরোধ করব আইন করার জন্য, যাতে কোনো মসজিদ-মাদ্রাসায় রাজনৈতিক সভা বা মিটিং করা না যায়।”
