‘আমরা নদী ভাঙা লোক, পাটনাদার হিসেবে (ভাড়া) পরের জাইগায় রইছি। আমাদের জায়গা জাগছে, মনে করছি অহনে বাড়ি করমু। সরকারের কাছে আমাগো দাবি- এই ড্রেজারডা যেন উঠায় নেয়। নইলে আমাগো আরও ক্ষতি অইয়্যা যাইবো, আমরা ঘরবাড়ি করতে পারমু না।’
নদী ভাঙনে দিশেহারা হয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখলেও সেই স্বপ্ন যেন ফিকে হওয়ার পথে বিধবা নুরুন্নাহার বেগমের (৫২)। জেগে উঠা জায়গায় স্থানীয় এক বিএনপি নেতা অবৈধভাবে ড্রেজার বসানোয় কপালে চিন্তারভাজ নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন তিনি। আড়িয়াল খাঁ নদের ভাঙনে বসতঘর, জায়গা-জমি হারিয়ে পরিবার নিয়ে অন্যের বাড়িতে দীর্ঘদিন যাবৎ ভাড়ায় বসবাস করে আসছেন।
তাঁরমতো যুগ যুগ ধরে ভাঙন প্রবণ আড়িয়াল খাঁ নদের ভাঙনে দিশেহারা দুইপাড়ের বাসিন্দারা। ভাঙনে অপরপাড়ে বসতঘর নির্মাণ করলে সেখানেও নতুন করে চলতি বছরে ভাঙনের মুখে পড়েছেন তাঁরা। এরমধ্যেও নদটি থেকে বালু উত্তোলন করতে অবৈধভাবে ড্রেজিং মেশিন বসিয়েছে স্থানীয় এক বিএনপি নেতা। এতে তীব্র ভাঙন আতঙ্কে অবৈধ ড্রেজার তুলে নিতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চেয়ে মানববন্ধন করেছেন স্থানীয়রা।
আজ বুধবার (২৪ জুন) দুপুর আড়াইটার দিকে ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার চরমানাইর ইউনিয়নের আমির-খাঁ কান্দি গ্রামে নদটির ভাঙন কবলিত পাড়ে দাড়িয়ে মানববন্ধন করেন তাঁরা। এতে গ্রামটির অর্ধশত নারী-পুরুষ অংশগ্রহণ করেন।
তাঁদের অভিযোগ, সম্প্রতি নদটির আমিরখাঁর এলাকায় অবৈধভাবে ড্রেজার বসিয়েছেন সদরপুর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুর রাজ্জাক খাঁ। বিষয়টি প্রশাসনকে অবগত করা হলেও ড্রেজার তুলে নেওয়া হয়নি। এছাড়া স্থানীয় বাসিন্দাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে চাপ সৃষ্টি করে বালু উত্তোলনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।
মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা জানান, চরমানাইর ইউনিয়নের ৯০ শতাংশ এলাকা পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁ নদ বেষ্টিত। এলাকাটিতে বর্তমানে প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার মানুষের বসবাস রয়েছে। যুগ যুগ ধরে নদটির ভাঙনের শিকার হয়েছেন এলাকাটির অসংখ্য পরিবার। নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে প্রায় হাজার একর জমি।
ভাঙনের মুখে বসতঘর হারিয়ে অন্যপাড়ে নতুন করে বসতি স্থাপন করলেও চলতি বছরে সেইপাড়ও ভাঙনের মুখে পড়েছেন। এছাড়া গত দুই বছর ধরে অপরপাড়ে জেগে উঠছে হারিয়ে যাওয়া জমি। সেই পাড়েই অবৈধভাবে ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ওই বিএনপি নেতা। এতে ভাঙনের তীব্রতা বেড়ে শত শত পরিবার বাস্তুচ্যুত হওয়ার আতঙ্কে রয়েছেন। পাশাপাশি জেগে উঠা পাড়ও নদী গর্ভে হারিয়ে যাবে বলে তাঁরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
স্থানীয় সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম বাবুল ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করে মো. ফরহাদ হোসেন নামে এক ব্যক্তি বলেন- ‘আড়িয়াল খাঁ নদের কারনে দীর্ঘদিন যাবৎ বাড়িঘর ভেঙে নিয়ে যাচ্ছে। নতুন করে পাড়টি জেগে উঠেছে, মানুষ নতুন করে ঘরবাড়ি করার চিন্তা ভাবনা করছেন। কিন্তু বর্তমানে এই এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তি আব্দুর রাজ্জাক খাঁর নেতৃত্বে ড্রেজার বসানো হয়েছে৷ এই ড্রেজার দিয়ে বালু তুললে আর ঘরবাড়ি তোলা হবে না। তাছাড়া বসতি স্থাপন করা পাড়ও তীব্র ভাঙনের মুখে পড়বে।’
মানববন্ধনে অংশ নেয়া স্কুল শিক্ষক মো. গোলাম মোস্তফা বলেন- ‘নদী এমনেই ভাঙতেছে প্রবলভাবে, আবার ড্রেজার বসিয়ে কূমের মতো সৃষ্টি হয়ে ভাঙনের তীব্রতা আরও বেড়ে যাবে। আমাদের জমিও আর জাগবে না; এলাকার লোকজন জমিজমা আর বসতবাড়ি থেকে উচ্ছেদ হয়ে যাবে। তাই আমরা চাই- অতিদ্রুত এই ড্রেজার সরিয়ে নেয়া হোক।’
জানতে চাইলে বিএনপি নেতা আব্দুর রাজ্জাক খাঁ দাবি করেন, নিজস্ব জায়গায় স্থাপিত প্রাথমিক বিদ্যালয় ও উচ্চ বিদ্যালয় সম্প্রতি ঝড়ে ভেঙে গিয়েছে। নতুন করে দুটি ঘর করা হয়েছে এবং ভিটি ভরাট করার জন্য বালু উত্তোলনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সে বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও ইউএনও অবগত আছেন বলে জানান৷
তিনি বলেন- নদীটি চলমান, যার পশ্চিমপাড় গড়ে পূর্বপাড় ভাঙতেছে। এখানে ড্রেজার বসালেও বর্ষা শেষে তা পূরণ হয়ে যাবে৷ তাই স্কুলের প্রয়োজনে ৩০ হাজার ফিট বালু লাগবে- আমি এমপি ও ইউএনও’র অনুমতি নিয়ে ড্রেজার বসিয়েছি। কিন্তু একটি স্বার্থান্বেষী মহল আমার ভাল কাজে ইশার্ন্বিত হয়ে প্রোপাগাণ্ডা ছড়াচ্ছে।
তবে ড্রেজার বসানোর কোনো অনুমতি দেয়া হয়নি দাবি করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শরীফ শাওন সাংবাদিকদের বলেন- ‘ড্রেজারের বসানোর বিষয়ে মৌখিকভাবে জেনেছি এবং ইতিমধ্যে ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যানকে বাঁধা দেওয়ার জন্য বলে দিয়েছি। নিজ উদ্যোগে যদি ড্রেজার সরিয়ে না নেয় তাহলে পরবর্তীতে আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হব।’
