ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) কবি জসীম উদ্দীন হলে মাঠের নির্ধারিত ভাড়া না দিয়েই বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা প্রদর্শন করছে ‘এ্যাথলেট স্পোর্টস গিয়ার’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। অভিযোগ উঠেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সহযোগিতায় নিয়ম ভঙ্গ করে এ প্রদর্শনী চলছে।
জসীম উদ্দীন হলের নিজস্ব নিয়ম অনুযায়ী, হল মাঠ বরাদ্দ নিতে হলে হল প্রাধ্যক্ষের পূর্বানুমতি নিতে হয়। হল প্রশাসনকে একটি নির্দিষ্ট ফি পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, ছাত্রদলের সহায়তায় ‘এ্যাথলেট স্পোর্টস গিয়ার’ নামের প্রতিষ্ঠানটি এ নিয়ম ভঙ্গ করেছে। তারা হল প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া এবং কোনো ভাড়া পরিশোধ না করেই হল মাঠে বিশ্বকাপ খেলা দেখাচ্ছে।
মাঠ ভাড়ার টাকা না দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক মল্লিক ওয়াসি উদ্দীন তামি প্রশ্ন করেন, ‘মাঠের ভাড়া দিতে হবে—এমন কোনো আইন আছে নাকি?’ তিনি বলেন, হলের কোনো আইনে এটি নেই। হলের আইনে যদি থাকেই তাহলে তা লিখিতভাবে দেখানোর কথা উল্লেখ করেন তিনি। এছাড়া এ বিষয়ে ‘এ্যাথলেট স্পোর্টস গিয়ার’-এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা এ মুহূর্তে কথা বলতে রাজি হয়নি।
কিন্তু মাঠ বরাদ্দের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোর নিজস্ব সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে হল প্রশাসনের বক্তব্যে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু কবি জসীম উদ্দীন হল নয়, হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল, জগন্নাথ হলসহ বিভিন্ন হলে মাঠ বরাদ্দের ক্ষেত্রে নিজস্ব নিয়মনীতি রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে মাঠ বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণত এ নীতিমালা অনুসরণ করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী, বাইরের কাউকে মাঠ ব্যবহারের অনুমতি দিলে সংশ্লিষ্ট হল প্রশাসন নির্ধারিত ফি গ্রহণ করে থাকে।
এছাড়া হল প্রশাসনের অনুমতি নেওয়ার বিষয়ে তামি বলেন, ‘খেলা দেখানোর জন্য হল প্রশাসন থেকে যথাযথ অনুমতি নেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচটি হলে ছাত্রদলের (কবি জসীম উদ্দীন হল, বিজয় ৭১ হল, মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল, শেখ মুজিবুর রহমান হল ও মাস্টারদা সূর্যসেন হল) পক্ষ থেকে একটি দরখাস্ত করে আমরা হল প্রশাসন ও প্রক্টরের অনুমোদন নিয়েছি।’
তবে হল প্রশাসনের দাবি, খেলা দেখানোর জন্য আনুষ্ঠানিক কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি। ছাত্রদলের দেওয়া তথ্যমতে, গত ২৬ এপ্রিল তারা প্রক্টর বরাবর একটি আবেদন করেছিল, যেখানে জসীম উদ্দীন হলের প্রাধ্যক্ষ ‘রিসিভড’ লিখে স্বাক্ষর করেছিলেন। ওই আবেদনে কোনো আয়োজক প্রতিষ্ঠানের নাম বা স্টল বসানোর উল্লেখ ছিল না। পরবর্তীতে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় ‘এ্যাথলেট স্পোর্টস গিয়ার’-কে আয়োজক হিসেবে অনুমোদন দিলে ছাত্রদলের প্রাথমিক আবেদনটি অকার্যকর হয়ে যায় বলে জানায় হল প্রশাসন। এরপর আয়োজক প্রতিষ্ঠান প্রক্টরের কাছে নতুন করে আবেদন করলে তিনি ‘স্ব-স্ব কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে’ তা অনুমোদন করেন। কিন্তু চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য সেই আবেদনটি আর হল প্রাধ্যক্ষের কাছে পাঠানো হয়নি।
এ বিষয়ে কথা হয় কবি জসীম উদ্দীন হলের প্রাধ্যক্ষের সঙ্গে। মাঠ ভাড়ার টাকা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা আছে কি না জানতে চাইলে জসীম উদ্দীন হলের প্রাধ্যক্ষ ড. এস এম আরিফ মাহমুদ বলেন, ‘আমাদের হলের নিয়মে নির্ধারিত ভাড়ার কথা উল্লেখ আছে। হল অফিসে খোঁজ নিলেই দেখতে পাবেন। তাই যারা বলে মাঠ ভাড়ার টাকা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই, তারা কোথা থেকে বলে তা তারাই ভালো বলতে পারবে।’
ভাড়া পরিশোধ না করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘জসীম উদ্দীন হলের নিয়ম অনুযায়ী পুরো দিনের জন্য মাঠ ভাড়া এক হাজার টাকা ও অর্ধদিবসের জন্য পাঁচশত টাকা। এটি হল প্রশাসনের নিজস্ব নিয়ম, কারো ব্যক্তিগত নিয়ম নয়। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ ও মুহসীন হলের মাঠেও নির্দিষ্ট ভাড়া নির্ধারণ করা আছে।’ তবে হলের নিয়ম অনুযায়ী জসীম উদ্দীন হল মাঠের এ নির্ধারিত ভাড়া না দিয়েই খেলা দেখানো হচ্ছে বলে তিনি জানান।
হল প্রশাসনের অনুমতি নেওয়া হয়েছে কি না জানতে চাইলে ড. আরিফ মাহমুদ জানান, বিশ্বকাপ শুরুর প্রায় এক মাস আগে ছাত্রদলের নেতারা খেলা দেখানোর অনুমতি চেয়ে একটি আবেদন করেছিলেন, যা প্রক্টরের মাধ্যমে হল প্রশাসনের কাছে পৌঁছায় ও হল প্রশাসন সেটি রিসিভ করে। কিন্তু পরবর্তীতে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় কেন্দ্রীয়ভাবে খেলা দেখানোর উদ্যোগ নেয়। এর ফলে আগের চিঠিটি অকার্যকর হয়ে যায়। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ছাত্রদলের নেতারাও আর এ আয়োজনে এগিয়ে আসেনি।
তিনি আরও বলেন, গত ২৮ জুন মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত একটি চিঠি ইস্যু করা হয়। চিঠিতে আয়োজকদের সার্বিক সহযোগিতা করার কথা বলা হলেও সেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল যে পুরো প্রক্রিয়াটি হল প্রশাসনের অনুমতি সাপেক্ষে সম্পন্ন করতে হবে। কিন্তু বর্তমানে যারা খেলা দেখাচ্ছে, তারা হল প্রশাসনের সঙ্গে কোনো প্রকার যোগাযোগ করেনি। এমনকি তারা কোনো আনুষ্ঠানিক অনুমতিও নেয়নি।
উল্লেখ্য, জসীম উদ্দীন হল মাঠে বিশ্বকাপ খেলা দেখানোকে কেন্দ্র করে গত ১ জুলাই জসীম উদ্দীন হল সংসদ ছাত্রদলের বিরুদ্ধে অনুমতি ছাড়া মাঠ ব্যবহার, মাঠ বরাদ্দের অর্থ পরিশোধ না করা, অবৈধভাবে দোকান বসিয়ে অর্থ আদায় ও চাঁদাবাজির অভিযোগ তোলে। এর জবাবে ওই দিন রাত ১২টায় সংবাদ সম্মেলন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল হল সংসদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, অনলাইনে অপপ্রচার ও গুজব ছড়ানো, অনুমতি থাকা সত্ত্বেও কাজে বাধা দেওয়া এবং স্টাফদের বেআইনিভাবে আটকে রাখার পাল্টা অভিযোগ আনে। পরে গতকাল রাত পৌনে ১১টায় হল সংসদ আবারও সংবাদ সম্মেলন করে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, অর্থ লোপাট, অনুমোদনহীন কার্যক্রম এবং মিথ্যা অপপ্রচার চালানোর অভিযোগ তোলে।
