এদিকে রেলমন্ত্রী বলেছেন, আমাদের কাছে প্রতিদিন এমন অনেক আবেদন আসে। এগুলো আইন ও বিধি-বিধান অনুযায়ী নিষ্পত্তির জন্য সচিবকে মার্ক করে পাঠিয়ে দেই। যুবলীগ নেতা জি কে শামীম কিংবা তার মনোনীত কোনো ব্যক্তির সঙ্গে তার দূরতম সম্পর্কও নেই বলে জানান তিনি। সরল বিশ্বাসেই তিনি আবেদনটিতে সহযোগিতা করার কথা লিখেছেন।
রেলপথ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ১১ জুন জি কে শামীমের স্বাক্ষরিত আবেদনটিতে রেলমন্ত্রী ১৫ জুন সচিবকে নির্দেশনাসহ পাঠান। আবেদনের উপরে মন্ত্রী সচিবকে উদ্দেশ করে লিখেছেন, ‘প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করুন।’
আবেদনটি মন্ত্রীর দপ্তরের ডায়েরিতে অন্তর্ভুক্ত না করেই সরাসরি সচিবের দপ্তরে পাঠানো হয়। এরপর ১৭ জুন সচিবের দপ্তরের রেজিস্ট্রারে এটি ১২৯২ ক্রমিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব আবেদনটি নিষ্পত্তির জন্য মন্ত্রণালয়ের আইন ও ভূমি শাখায় পাঠিয়ে দেন।
কর্মকর্তাদের মতে আবেদনটিই বেআইনি
রেল মন্ত্রণালয় ও রেলওয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, টানা ১০ বছর রেলওয়ের সব স্থাপনা এককভাবে ব্যবহারের নির্দেশনা চেয়ে জি কে শামীমের আবেদনটিই বেআইনি। এমন আবেদন কোনোভাবেই মন্ত্রণালয় গ্রহণ করতে পারে না।
রুলস অব বিজনেস না মেনে আবেদনের ওপর মন্ত্রীদের দেওয়া নির্দেশনাগুলো নিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই মন্ত্রণালয়ের সচিব ও কর্মকর্তাদের বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয় বলে জানান জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মো. ফিরোজ মিয়া। আমার দেশকে তিনি বলেন, মন্ত্রীরা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হওয়ায় জনগণের অনেক আবদার তাদের মানতে হয়। কিন্তু এটাতে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা বিপদে পড়েন। যেখানে আইন, বিধি-বিধান ও নীতিমালার বিষয় জড়িত, সেসব বিষয়ে কেউ আবেদন করলে তা পদ্ধতিগতভাবেই নিষ্পত্তি করতে হয়। এখানে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে আগ্রহীদের মধ্যে প্রতিযোগিতার বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে হয়। এসব ক্ষেত্রে মন্ত্রীরা কোনো নির্দেশ দিলেও সেটা রুলস অব বিজনেস ও দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী কার্যকর নয়। কাজেই এসব ক্ষেত্রে মন্ত্রীদেরও নিয়ম মেনে চলা উচিত। তবে সেবামূলক কাজে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মন্ত্রীর যে কোনো নির্দেশনা দেওয়াটা দোষের কিছু নয়। এমনিতেই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা জনবান্ধব নয় বলে সাধারণ মানুষের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। ফলে সেবার জন্য রাজনীতিবিদদের কাছেই তারা যায়।
জি কে শামীমকে নিয়ে প্রশ্ন
২০১৯ সালে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে জি কে শামীমের নাম আসে যুবলীগের তৎকালীন বিতর্কিত নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী ওরফে সম্রাটের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে। রাজধানীর ক্যাসিনোকেন্দ্রিক অবৈধ আয়ের একাংশ আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের মধ্যে ভাগাভাগি হতো, আর এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন জি কে শামীম ও সম্রাট। তবে জি কে শামীমের মূল পরিচিতি ছিল গণপূর্ত অধিদপ্তরের টেন্ডার ব্যবসার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক হিসেবে। যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-প্রচার সম্পাদক পরিচয় ব্যবহার করে তিনি একের পর এক বড় সরকারি নির্মাণ প্রকল্পের কার্যাদেশ বাগিয়ে নিতেন।
২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের মাধ্যমে দেশের মানুষ প্রথমবারের মতো জানতে পারে, রাজধানীর অভিজাত ক্লাবগুলো ঘিরে কীভাবে গড়ে উঠেছিল বিশাল অবৈধ অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক। তখন রাজধানীর নিকেতনে তার বিলাসবহুল কার্যালয়ে র্যাব অভিযান চালায়। সেখান থেকে উদ্ধার হওয়া অস্ত্র ও নগদ অর্থের পরিমাণ দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে। তার অফিস থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল আটটি আগ্নেয়াস্ত্র, শত কোটি টাকার এফডিআর, বিপুল নগদ টাকা আর বিদেশি মদ। সাত দেহরক্ষীসহ তাকে গ্রেপ্তার করার পর দেশের মানুষ ভেবেছিল মাফিয়াতন্ত্রের বুঝি অবসান ঘটল। এরপর একে একে তার বিরুদ্ধে দায়ের হয় অস্ত্র, মাদক, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও মানিলন্ডারিং মামলা। এর মধ্যে অর্থপাচার মামলায় নিম্নআদালত তাকে দণ্ডিত করলেও পরবর্তী সময়ে উচ্চ আদালত সেই রায় বাতিল করে খালাস দেয়। অন্যদিকে দুদকের মামলায় আদালত হাজতবাসে কাটানো সময়কে সাজার মেয়াদ হিসেবে বিবেচনা করায় ওই মামলাতেও তাকে কারাগারে রাখার সুযোগ থাকেনি বলে কারা সূত্র আমার দেশকে জানিয়েছে। এর আগে দুদকের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে তার ও তার মায়ের নামে প্রায় ২৯৭ কোটি টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের তথ্য। এসব সম্পদের বড় অংশের বৈধ উৎস খুঁজে পাওয়া যায়নি বলেও উল্লেখ করা হয়।
রেলওয়ের সবকিছুই এককভাবে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার আবেদনের বিষয়ে জি কে শামীমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে আমার দেশ। আবেদনে দেওয়া মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি রিসিভ করেননি। খুদে বার্তা দেওয়ার পর তিনদিন অপেক্ষা করলেও তিনি জবাব দেননি।
সরেজমিনে গত সোমবার জি কে শামীমের অফিস রাজধানীর গুলশান-১-এর নিকেতন আবাসিক এলাকার এ ব্লকের ৫ নম্বর সড়কের ১৪৪ নম্বর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, দেয়ালে অস্পষ্টভাবে লেখা রয়েছে ‘জি. কে. বি অ্যান্ড কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড’। নিকেতন কেন্দ্রীয় মসজিদ থেকে অল্প দূরত্বে অবস্থিত বাড়িটির মূল ফটক পেরিয়ে ভেতরে গেলে কোম্পানির নাম ও লোগোসংবলিত গোলাকার মনোগ্রামও চোখে পড়ে।
প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল একাধিক স্টাফ এ প্রতিবেদককে জানান, বাড়িটি জি কে শামীমের মালিকানাধীন এবং এখানেই কোম্পানির কার্যক্রম পরিচালিত হয়। জি কে শামীম নিয়মিত এ কার্যালয়ে আসেন। তবে দিনের বেলায় নয়, অধিকাংশ সময় সন্ধ্যার পর তিনি অফিসে প্রবেশ করেন। এ সময় কোম্পানির অফিস দেখার কথা বললে গেটে দায়িত্বরত কর্মী সন্ধ্যার পর আসতে বলেন।
এ বিষয়ে যুবদলের সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন আমার দেশকে বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার সহযোগী বা তাদের কোনো স্টেকহোল্ডার একচ্ছত্রভাবে ব্যবসার সুযোগ পাকÑ এটি দেশের মানুষ চায় না। সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমিও তা চাই না। ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে এ ধরনের কর্মকাণ্ড অত্যন্ত দুঃখজনক ও অনাকাঙ্ক্ষিত।’
জি কে শামীমের এমন অদ্ভুত আবেদনের বিষয়ে রেলমন্ত্রী আমার দেশকে আরো বলেন, ‘আমরা নীতিমালার বাইরে যাব না। যাওয়ার সুযোগও নেই।’ চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে বিষয়টি আরো ভালোভাবে খতিয়ে দেখা হবে বলেও জানান তিনি।
