দিয়াবাড়িতে বিএনপি পরিচয়ে সরকারি জমি দখল করে কোটি টাকার ‘দোকান-বাণিজ্য’

সাড়ে চারশ বছরের পুরোনো ঢাকা শহর ক্রমেই হারাচ্ছে তার খোলা জায়গা ও সবুজতা। সেই সংকুচিত নগরজীবনে উত্তরার দিয়াবাড়ি ছিল কিছুটা ব্যতিক্রম – প্রশস্ত সড়ক, সারি সারি গাছ আর বিস্তীর্ণ খোলা আকাশে গড়ে ওঠা এক টুকরো স্বস্তির পরিসর। রাজধানীর কংক্রিটের ভিড়ে দিয়াবাড়ি যেন নগরবাসীর জন্য ছিল একখণ্ড খোলা নিঃশ্বাস।

তবে সেই দিয়াবাড়িও এখন দখল ও বাণিজ্যিক স্থাপনার চাপে বদলে যাচ্ছে। উত্তরার তৃতীয় পর্বের খালপাড় থেকে দিয়াবাড়ি গোলচত্বর পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে গড়ে উঠেছে শত শত দোকান ও বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি জমি দখল করে এসব স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে। আর এসব দোকান থেকে মাসে আদায় হচ্ছে কোটি টাকার বেশি ভাড়া।

স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির অভিযোগ, বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের কয়েকজন নেতার রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে গড়ে উঠেছে এই দখল-বাণিজ্যের নেটওয়ার্ক। স্থানীয় সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীরের রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে এ সাম্রাজ্য গড়ে ওঠারও অভিযোগ রয়েছে। স্টার নিউজের বিশেষ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে দিয়াবাড়ির এই দখল-বাণিজ্যের বিস্তৃত চিত্র।

উত্তরা তৃতীয় পর্বের খালপাড় থেকে দিয়াবাড়ি গোলচত্বর পর্যন্ত সড়কের এক পাশে রয়েছে ফায়ার সার্ভিস স্টেশন, মেট্রোরেল স্টেশন, স্কুলসহ অসংখ্য আবাসিক স্থাপনা। স্থানীয়দের ভাষ্য, বছরখানেক আগেও সড়কের দুই পাশে ছিল সারি সারি গাছ। এখন সেই দৃশ্য অনেকটাই বদলে গেছে।

অভিযোগ রয়েছে, রাতের আঁধারে গাছ কেটে জায়গা তৈরি করে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে ফার্নিচারের দোকান, গাড়ির চাকার দোকান, খাবারের হোটেল, গ্যারেজসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান।

স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘দখলের গ্রাস এখন দিয়াবাড়িতেও পড়েছে। এখন মানুষ আর মুক্তমনে রাস্তায় ঘোরাফেরা করতে পারে না। যেসব রাস্তা ৩০০, ২০০ বা ১০০ ফুটের ছিল, সেগুলোর দুই-তৃতীয়াংশই দখল হয়ে গেছে।’

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এসব স্থাপনার কারণে সড়কের একটি বড় অংশ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। প্রায়ই যানজট তৈরি হচ্ছে। যানজটের প্রভাব পড়ছে মেট্রোরেল স্টেশন পর্যন্ত। রিকশা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ায় অনেককে হেঁটে যাতায়াত করতে হচ্ছে।

অনুসন্ধানে সড়কের দুই পাশে বিভিন্ন ধরনের প্রায় ২৮৫টি দোকানের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে প্রায় ১২৫টি ফার্নিচারের দোকান, ৭০টি গাড়ির চাকার দোকান এবং খাবারের হোটেল, গ্যারেজসহ অন্যান্য দোকান রয়েছে প্রায় ৯০টি। স্থানভেদে একেকটি দোকানের মাসিক ভাড়া ৩৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত। এই হিসাবে শুধু এসব দোকান থেকেই মাসে প্রায় ১ থেকে দেড় কোটি টাকা ভাড়া আদায়ের হিসাব পাওয়া গেছে।

কিন্তু সরকারি জমিতে গড়ে ওঠা এসব স্থাপনা থেকে আদায় করা এই বিপুল অর্থ যাচ্ছে কার পকেটে, এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই শুরু হয় অনুসন্ধানের পরবর্তী ধাপ। দোকানিদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলে অনেকে ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হননি। কেউ কেউ এড়িয়ে গেছেন প্রশ্ন। আবার কারও আচরণ ছিল আক্রমণাত্মক।

তবে পরিচয় গোপন রাখার শর্তে কথা বলতে রাজি হওয়া এক ভুক্তভোগী জানান, দখলদারদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে তাকে হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। তার ভাষ্য, ‘ওরা এখানে এসে ভাঙচুর চালিয়েছে, তল্লাশি করেছে। আমরা যদি বলতাম দোকান ছাড়ব না, তখন মারতে আসত। যেভাবে পারত অত্যাচার করত।’

ওই ভুক্তভোগীর অভিযোগ, স্থানীয় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের কয়েকজন নেতা এই দখল-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। তিনি হারুন, রনি, রাজিব, রিপন ও মিন্নাত আলীসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করেন। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে অনুসন্ধানকারীরা ভাড়াটিয়ার পরিচয়ে স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

প্রথমে যোগাযোগ করা হয় স্থানীয় বিএনপি নেতা মিন্নাত আলী ও তার সহযোগী ইমরানের সঙ্গে। মিন্নাতের ফোন বন্ধ থাকায় ইমরানের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, নির্দিষ্ট জায়গায় দোকান করতে হলে আগাম টাকা দিতে হবে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ‘নিজের দোকান নিজে বানিয়ে নিতে হবে’ এবং এ জন্য দুই লাখ টাকা অগ্রিম দিতে হবে।

তিনি আরও দাবি করেন, সড়কের উত্তর পাশে নার্সারি ও গ্যারেজসহ অন্তত ২০টি ফার্নিচারের দোকান তার ও মিন্নাত আলীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

ইমরানের দাবি-সড়কের উত্তর পাশে নার্সারি ও গ্যারেজসহ অন্তত ২০টি ফার্নিচারের দোকান তার ও মিন্নাত আলীর দখলে। কোনো জায়গা খালি না থাকায়, নির্দ্বিধায় সরকারি গাছ কেটে আমাদের দোকান বানিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেন ইমরান!

এরপর অনুসন্ধান টিম যোগাযোগ করে চণ্ডালভোগ ইউনিট বিএনপির সভাপতি রাজিব ইসলামের সঙ্গে। ভাড়াটিয়ার পরিচয়ে কথা বললে রাজিব জানান, দোকানপ্রতি পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত অগ্রিম দিতে হবে। তার ভাষ্য, নিজে দোকান তৈরি করলে খরচ কিছুটা কম হবে।

কথোপকথনে রাজিব দাবি করেন, বটতলা থেকে ফ্যান্টাসি আইল্যান্ড পার্ক পর্যন্ত এলাকার একটি অংশ তার নিয়ন্ত্রণে। আর চণ্ডালভোগ রাস্তার মাথা থেকে দিয়াবাড়ি গোলচত্বর পর্যন্ত অংশ তার ভাই রিপনের নিয়ন্ত্রণে। রাজিব বলেন, ‘এ জায়গায় আমার আছে ২৭টা। ওদিক পুরোটা আমার ভাইয়ের দখলে।’

অনুসন্ধানে কথা বলা ইমরান, রাজিব ও মাসুদসহ কয়েকজনের বক্তব্যে উঠে আসে তুরাগ থানা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হারুন রহমানের নাম। তাদের দাবি, পুরো দখল-বাণিজ্যের অন্যতম নিয়ন্ত্রক হারুন রহমান। দোকানের ভাড়া ও অগ্রিম হিসেবে আদায় করা অর্থের বড় একটি অংশ তার কাছে যায় বলেও দাবি করেন তারা।

ইমরানের ভাষ্য, ‘হারুন মামারা লিজ নিয়েছে। ওদেরকেই দোকানপ্রতি ৩৫ হাজার টাকা দিতে হয়।’

গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা কথোপকথনের পর অভিযুক্তদের বক্তব্য জানতে সরাসরি মাঠে যায় অনুসন্ধানী দল। ইমরানের কাছে গাছ কাটা ও সরকারি জমিতে দোকান নির্মাণের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো সন্তোষজনক উত্তর দেননি। জুয়েল ও তার ভাই মাসুদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে সরে যান। ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

রাজিব ইসলামের সঙ্গেও সরাসরি কথা বলার চেষ্টা করা হয়। প্রথমে তাকে বাড়িতে পাওয়া যায়নি। পরে তার কার্যালয়ে গিয়ে সাক্ষাৎ পাওয়া গেলেও সরকারি জমি দখল ও গাছ কাটার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে কার্যালয়ের দরজা বন্ধ করে দেন।

দখল-বাণিজ্যের অভিযোগের কেন্দ্রে থাকা হারুন রহমানের বক্তব্য জানতে দুই দিন ধরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। পরে তার বাড়িতে গিয়ে কথা বলার চেষ্টা করা হলে তিনি সাংবাদিকদের এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। সরকারি জমি দখল ও গাছ কাটার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে হারুন দাবি করেন, এসব দোকান বৈধ এবং সিটি করপোরেশন থেকে লিজ নেয়া হয়েছে। তার এই দাবি যাচাই করতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নথি পর্যালোচনা করা হয়।

সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, উত্তরা তৃতীয় পর্বের ওই সড়কটি মূলত রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) অধীন। তবে সড়কটির সৌন্দর্যবর্ধন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনকে দেয়া হয়েছিল।

সিটি করপোরেশনের নথি অনুযায়ী, গত ৩০ অক্টোবর সড়কটির পাশে ১০০ বর্গফুট আয়তনের ১৩৪টি অস্থায়ী ফুডকোর্টের অনুমোদন দেয়া হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, অনুমোদনের শর্ত না মেনে পরে সেখানে গাছ কেটে ফার্নিচারের দোকানসহ বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে তোলা হয়।

অনিয়মের বিষয়টি চিহ্নিত হওয়ার পর একই বছর ওই অনুমোদন বাতিল করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। এরপর স্থাপনা টিকিয়ে রাখতে ফুডকোর্ট বরাদ্দ পাওয়া ব্যক্তিদের একজন উচ্চ আদালতে রিট করেন। চলতি বছরের ১২ মার্চ আদালত তিন মাসের স্থগিতাদেশ দেন। সেই মেয়াদও ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।

তবুও সরেজমিনে দেখা গেছে, বিতর্কিত স্থাপনাগুলো এখনো বহাল রয়েছে। অবৈধ স্থাপনাগুলো এখনো কেন উচ্ছেদ করা হয়নি–এ প্রশ্নের জবাবে রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলাম আদালতে চলমান মামলার কথা উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, ‘আমরা একটি মামলা লড়ছি। আশা করছি, শিগগিরই আমরা কোর্টের রায় পাব। যে স্থাপনাই করুক, রায় পেলে এটা আমরা উচ্ছেদ করব।’

তবে অনুসন্ধানী দলের কাছে থাকা আদালতের আদেশের কপি দেখানোর পরও স্থাপনাগুলো উচ্ছেদে প্রশাসনিক পদক্ষেপের বিষয়ে তিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি।

দিয়াবাড়ির দখল-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িতদের কয়েকজন স্থানীয় বিএনপি নেতা এবং তাদের রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দা, দলীয় ব্যক্তি ও রাজউকের একাধিক সূত্র অভিযোগ করেছেন। তাদের দাবি, হারুন রহমান স্থানীয় সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীরের ঘনিষ্ঠ এবং রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়েই সরকারি জমিতে এই বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছে।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি বলেন, ‘আমি একটি দল করি। আমার সঙ্গে অনেক নেতা-কর্মীর সম্পর্ক থাকে। আমি যাকে চিনি সেও আমার সঙ্গে ছবি তোলে। যাকে চিনি না, সেও ছবি তোলে। দল করে যারা সবাই আমার ক্লোজ, এটা ঠিক। কিন্তু দলের এক চুল পরিমাণ ক্ষতি হবে, এরকম কাজ যারা করবে, জনগণের অকল্যাণ হবে, এরকম কাজ যারা করবে, ব্যক্তিগতভাবে খোঁজ নিয়ে দেখেন তাকে আমি আর চিনি না। সে যেই হোক।’

দিয়াবাড়ির এই চিত্র কেবল কয়েকশ দোকান বা কোটি টাকার ভাড়া আদায়ের হিসাব নয়। এটি রাজধানীর খোলা জায়গা ও সবুজ হারিয়ে যাওয়ারও আরেকটি উদাহরণ। যে সড়কের দুই পাশে একসময় ছিল গাছের সারি, সেখানে এখন দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি বাণিজ্যিক স্থাপনা। সংকুচিত হয়েছে সড়ক, বেড়েছে যানজট ও জনদুর্ভোগ।

Facebook
X
LinkedIn
Telegram
WhatsApp
Email