“বিয়ে করেছি অল্প সময় হল। দুজনের সংসার। এখনো নতুন মুখ আসেনি। এরমধ্যেই খরচের চাপে সংসারের প্রতি বিরক্তি চলে আসছে।”
জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার প্রসঙ্গ তুলতেই ছাত্র পড়িয়ে এবং স্ত্রীর চাকরির টাকায় সংসার চালানো সায়েদুল হক এভাবেই প্রতিক্রিয়া জানালেন। পুরান ঢাকার এই বাসিন্দা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ালেখা শেষ করে চাকরি খুঁজছেন।
দিন কয়েক আগে রাত সাড়ে ৯টার দিকে লালবাগে ছাতাওয়ালা মসজিদের পাশে দাঁড়িয়ে যখন এ যুবকের সঙ্গে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কথা হচ্ছিল, তখন তার চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ।
তাই, জিনিসপত্রের দাম নিয়ে কথা তুলতেই ৩০ বছর বয়সি সায়েদুলের কণ্ঠে বিরক্তি ঝরল। বললেন, দেড় বছর আগে বিয়ে করেছেন, তার নতুন সংসার আর নতুন স্বপ্নের জায়গা এখন দখল করে নিয়েছে মাসের খরচের হিসাবের চিন্তা।
“অনেক জরুরি জিনিস কিনতে পারি না ভাই। মাঝেমধ্যে এ নিয়ে আমাদের দুইজনের মধ্যে রাগারাগি হয়। কী করব বলেন? আসল সমস্যা তো সবকিছুর দাম বাড়তি।”
সংসারের কোন জিনিস কেনায় সবচেয়ে বেশি খরচ বেড়েছে? সায়েদুল একে এক গুনে দেখান গ্যাস, বিদ্যুৎ ও টয়লেট্রিজ বা ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা আর রূপ চর্চার পণ্যের হিসাব।
তার ভাষায়, “আমরা দুইজনের পরিবার। চার মাস আগে এক হাজার টাকার বিদ্যুৎ রিচার্জ করে ৩৫ দিন ব্যবহার করেছি। এ মাসে তা ব্যবহার করতে পেরেছি ২১-২২ দিন।
“গত মাসে ভুতুড়ে বিলের কবলে পড়ে হাজার টাকা শেষ হয়ে যায় ১৫ দিনে। হিসাব করে দেখলাম, বিদ্যুৎ বিল গত তিন মাসে প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়েছে।”
গ্যাসের হিসাবটাও সায়েদুলের মুখস্থ।
“আমরা সিলিন্ডার ব্যবহার করি। ১২ কেজির সিলিন্ডার যেটা চার মাস আগে কিনেছি ১ হাজার ৫০০ টাকায়, সেটা গত মাসে কিনেছি ২ হাজার ২৫০ টাকায়। আরো হিসাব চান?”
সায়েদুলের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা অবশ্য টয়লেট্রিজ পণ্য নিয়ে। নতুন বউয়ের কিছু শখ পূরণের চাপ থাকে। কাপড় ধোয়ার পাউডার, সাবান, শ্যাম্পুর মতো নিত্যব্যবহার্য পণ্য খানিকটা বেশিই লাগে।
তিনি বলেন, প্রতি দুই মাস অন্তর টয়লেট্রিজ পণ্য কেনেন তারা। ১ হাজার ৫০০ টাকা বাজেট। গেল ১৪ অগাস্ট একই পণ্য কিনতে গিয়ে খরচ হয়ে গেছে প্রায় ২ হাজার ৫০০ টাকা। এ দুই মাসে শুধু এসব পণ্যে ৩০-৪০ শতাংশ বেশি খরচ করতে হয়েছে।
“এসব ক্ষেত্রে ইউনিলিভারের প্রোডাক্ট ব্যবহার করতাম। এখন কমদামের লোকাল ব্র্যান্ডের পণ্য নেব।”
উদাহরণ দিয়ে সায়েদুল বলেন, যেমন আগে রিন পাউডার কিনতেন। দুই মাস আগে এক কেজি রিন পাউডার কিনেছেন ১৫০ টাকা দিয়ে। এ মাসে কিনতে হল ১৭৫ টাকায়।
খরচ বাড়ায় সায়েদুল একাই নন, শহুরে সীমিত আয়ের সব মানুষই এমন চাপে আছেন। যাদের সংসারে ছোট বাচ্চা আছে, তাদের খরচ বেড়েছে গাণিতিক হারে। মাছ, মাংস বা ডিমের মাধ্যমে পুষ্টির জোগান দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন সকলে।
বেশকিছুদিন ধরেই বাড়ছে চালের ডাম। মাছে ভাতে বাঙালির প্রধান খাদ্য চালের আমদানির কথা বলা হলেও দামে মিলছে না সুখবর।
পাইকারি বাজারে চালের দাম বৃদ্ধির কথা বলছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের ভাষ্য, গত এক সপ্তাহে মিনিকেট চালের ৫০ কেজির বস্তায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি দাম পড়েছে।
মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের পাইকারি চাল ব্যবসায়ী মোজাম্মেল হক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “কয়েক ধাপে হাতবদল ও পরিবহন ব্যয় বাড়ায় চালের দাম কখনো দুই-তিন টাকা বাড়ে, কখনো কমে।”
তিনি বলেন, পাইজাম চাল (মাঝারি) তাদের কেনা পড়ছে বস্তা প্রতি ২২০০ থেকে সাড়ে ২২৫০ টাকা। কেজিতে কেনা দাম ৪৪ থেকে ৪৫ টাকা। ছোট দোকানে কেজিতে একটু বেশি হবে। তারা বিক্রি করছেন ৫২ থেকে ৫৫ টাকা কেজি।
মাসের খরচের হিসাব মূলত বদলে যায় পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি সংকটে কয়েকদফা জ্বালানি তেল, তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস-এলপিজি ও বিদ্যুতের খরচ বাড়লে।
জুন মাসের শুরুতে সকল স্তরে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর একদিনের মাথায় বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) বলেছিল, খুচরায় বিদ্যুতের দাম বাড়লেও নিম্ন আয়ের মানুষ আগের দামেই বিদ্যুৎ পাবেন।
আবাসিকের প্রান্তিক ও প্রথম ধাপের গ্রাহকদের জন্য মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে সরকার। তাতে, ০ থেকে ৫০ ইউনিট ব্যবহারকারী লাইফলাইন বা প্রান্তিক গ্রাহক এবং ০ থেকে ৭৫ ইউনিট ব্যবহারকারী প্রথম ধাপের আবাসিক গ্রাহকদের বিদ্যুতের দাম বাড়েনি।
তবে কাগজে-কলমে সরকারের হিসাব একই থাকলেও গ্রাহকের কাগজ বলছে ভিন্ন কথা। সেখানে বিদ্যুতের দাম না বাড়লেও গতমাসে বেড়েছে বিদ্যুতের খরচা।
সায়েদুলের মতো ‘ভুতুড়ে’ বিল আসার অভিজ্ঞতা প্রায় সকলের। এ নিয়ে প্রতিবেদন হলে সরকার উল্টো ‘মিথ্যা তথ্য’ ছড়ালে আইনি ব্যবস্থার হুমকি দিয়ে রেখেছে।
জ্বালানি সংকটের মধ্যে গ্যাসের সরবরাহ কমায় এলপিজি ব্যবহার করে অনেকেই দিনের রান্না সারছেন। কেউ আবার বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করছেন। যারা বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করছেন তাদের যেমন বিদ্যুতের খরচা বাড়ছে, তেমনি এলপিজি কেনায়ও লাগছে বাড়তি খরচ।
শুধু এপ্রিল মাসে দুই দফায় এলপিজির দাম বাড়ানো হয়। রান্নার কাজে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত এই গ্যাসের দাম ১৯৪০ টাকায় গিয়ে ঠেকে। তার আগের গ্যাসের সংকটের কারণে ২৫০০ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হয়েছে গ্রাহককে।
তারপর কমে জুলাই মাসে দাঁড়ায় ১ হাজার ৫২৮ টাকা। অগাস্ট মাসে আবার ৭০ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৫৯৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
তবে সরকার যে দাম নির্ধারণ করে তা পাওয়া যায় না বাজারে; তাই সায়েদুলের মতো সকলকে কিনতে বাড়তি দরে। যা অনেক সময় ২ হাজার টাকায় পৌঁছে যায় বা ছাড়িয়ে যায়।
সীমিত আয়ের মানুষ এমন অসহনীয় ব্যয়ের মধ্যে কেমন করে জীবন চালাবে? কীভাবে তাদের জীবনে স্বস্তি ফিরবে?
গ্যাস সংকটে বেশিরভাগ সময় বন্ধ থাকছে ফতুল্লার ডায়িং কারখানাগুলো। ছবি: মোস্তাফিজুর রহমান
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক মোস্তফা কে মুজেরী মনে করছেন, বর্তমান সময়ে উৎপাদন বৃদ্ধি করে কর্মসংস্থান বাড়িয়ে আয় বাড়ানো হোক বা দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করে জনগণকে স্বস্তি দেওয়া হোক, প্রতিটি ক্ষেত্রে এখন ‘এক নম্বর’ বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে-জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এটিই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বর্তমান সময়ে অর্থনীতিকে সচল রাখার জন্য। যদি জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাটাকে ঠিক করা সম্ভবপর না হয়, অনিশ্চয়তা দূর করা না যায়, তাহলে তো কোনো প্রচেষ্টাই সফলতার মুখ দেখবে না।”
‘নীরবে মূল্যবৃদ্ধি’
মোহাম্মদপুরে নিত্যপ্রয়োজনীয় ও ঘরোয়া পণ্যের দোকান ডেইলি নিডসের স্বত্বাধিকারী তানভীর জয় কাউন্টারে দাঁড়িয়ে পণ্যের প্যাকেটের গায়ে লেখা ওজন আর দামের হিসাব মিলিয়ে দেখান, কীভাবে ‘নীরবে’ বদলে যাচ্ছে পণ্যের পরিমাণ।
“প্রায় সব পণ্যের দাম বেড়েছে। বাজারে ইউনিলিভারের চাহিদা বেশি, দামও বেশি। তারা যখন-তখন দাম বাড়ায়। হয় ওজন কমায়, নয় দাম বাড়ায়,” বলেন তিনি।
তানভীর একে একে তুলে ধরেন এই ‘নীরব মূল্যবৃদ্ধির’ নমুনা।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, ১৬ গ্রাম ওজনের সাদা প্যাকেটের একটি সার্ফ এক্সেলের দাম এখন ৫ টাকা। একই দামে সপ্তাহখানেক আগে ওজন ছিল ১৮ গ্রাম, প্যাকেট ছিল লাল। ১০ টাকা প্যাকেটের ওজন হয়ে গেছে ৩৬ গ্রাম; আগে ছিল ৪০ গ্রাম। লাক্স সাবান ৮৫ গ্রামেরটা ৮০ গ্রাম হয়ে গেছে। ৬৫ গ্রামেরটা ৬০ গ্রাম হয়ে গেছে।
অন্যদিকে এক কেজি ওজনের রিন পাউডারের দাম এখন ১৭৫ টাকা। মাসখানেক আগেও বিক্রি করেছেন ১৪৫-১৫০ টাকায়, বলেন তানভীর।
‘শ্রিংকফ্লেশন’ বা পণ্যের দাম না বাড়িয়ে পরিমাণ কমিয়ে দেওয়ার এই কৌশল ক্রেতার চোখ এড়িয়ে গেলেও তানভীরের মতো বিক্রেতাদের চোখ এড়ায় না।
তিনি বলছিলেন, প্রতিদিন প্যাকেট হাতে নিয়ে ওজন আর দাম মিলিয়ে দেখে নিজেই হতাশ হন। বিক্রেতার পাশাপাশি যে তারাও একেকজন ক্রেতা বা ভোক্তা।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কাছে ইউনিলিভার দাবি করেছে, কাঁচামালের খরচ যতটা বেড়েছে, ভোক্তার ওপর তার পুরো চাপ চাপানো হয়নি।
“ভোক্তাদের ওপর মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কমাতে কোম্পানি বিভিন্ন ব্যয়-সাশ্রয়ী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে পণ্যের ফর্মুলেশন (উপাদানের অনুপাত) সর্বোত্তমভাবে নির্ধারণের মাধ্যমে বিভিন্ন উপকরণের ব্যবহার কমানো।”
পুষ্টিতে কাটছাঁট
মৌচাকের ডাক্তার গলির বাসিন্দা কবির আহমেদ একটি বীমা কোম্পানিতে চাকরি করেন। পাঁচ সদস্যের সংসারে তার লড়াইটা সবার মতোই। সাপ্তাহিক বাজারের তালিকা থেকে একে একে বাদ পড়ছে পছন্দের খাবার।
তিনি বলেন, “আগে সপ্তাহে অন্তত একদিন মাছ-মাংস রাখার চেষ্টা করতাম। এখন প্রায়ই মাংস বাদ দিই, মাছের বদলে ডিম নিই। ডিমের দামও বেশি মনে হলে, সেটাও কমিয়ে দিই।”
তার কথায় ফুটে ওঠে সীমিত আয়ের পরিবার কীভাবে জীবন চালাতে গিয়ে পুষ্টিতে কাটছাঁট করছে।
কবিরের ভাষায়, “আগে বাজারে গিয়ে ভাবতাম কী খাব। এখন ভাবি, কী বাদ দিলে মাসটা চালানো যাবে। দুধ নিয়মিত কেনা হয় না, ফল কেনা হয় প্রয়োজন অনুযায়ী, মাছ-মাংসের পরিমাণ কমেছে। বাইরে খাওয়া প্রায় বন্ধ করে দিয়েছি।”
তিনি বলছিলেন, সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তটা অবশ্য আসে সন্তানদের সামনে।
“সবচেয়ে কষ্ট হয় যখন বাচ্চারা কোনো কিছু খেতে চায়, কিন্তু দাম শুনে মনে হয়—এটা আজ না হয় বাদই দিলাম। আগে হিসাব করতাম পকেটের টাকা দিয়ে কীভাবে ভালোভাবে মাস কাটাব। এখন হিসাব করি, কম খরচে কীভাবে মাসটা শেষ করব।”
পরিসংখ্যান কী বলছে?
জনমানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এমন অসহনীয় মাত্রায় পৌঁছলেও চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে আট মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন সার্বিক মূল্যস্ফীতির তথ্য দিয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-বিবিএস।
সরকারি হিসাব বলছে, খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভুত পণ্যের দাম কমায় এ মাসে মূল্যস্ফীতির পারদ বেশ খানিকটা নেমেছে। পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ।
গত বছরের নভেম্বরে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হয়েছিল দেশে; এরপর এটিই সবচেয়ে কম।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ২০ অগাস্টের সাপ্তাহিক দ্রব্যমূল্য পর্যালোচনা ও পূর্বাভাস সেল বলছে, এক সপ্তাহের মধ্যে দেশীয় বাজারে দাম বেড়েছে ময়দা, ডিম, চিনি ও এলাচের। কমেছে ইলিশ মাছের দাম।
সপ্তাহের ব্যবধানে তাদের কমার তালিকায় রয়েছে দেশি পেঁয়াজ, মুরগী, কাঁচামরিচ ও রুই মাছ।
এরমধ্যে পেঁয়াজ ও কাঁচা মরিচ টানা বৃষ্টিতে পচে যাওয়া ও সরবরাহে বিঘ্ন হয়ে অস্বাভাবিক দাম বেড়েছিল; সংকট কমে যাওয়ায় দাম কমার চিত্র পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে।
তবে বাজারের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের গত এক মাসের দাম বিশ্লেষণে দেখা যায়, আটার (খোলা) দাম বেড়েছে সাড়ে ১৪ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাস আগে দাম ছিল ৫৮ থেকে ৬০ টাকা। রোববার বিক্রি হয়েছে ৬৫ থেকে ৭০ টাকা। আর প্রতি কেজি প্যাকেট ময়দার দাম বেড়েছে ৭ শতাংশ।
গত মাসে ৪০ থেকে ৪৫ টাকায় বিক্রি হওয়া পেঁয়াজ কিনতে হচ্ছে ৫৫ থেকে ৬০ টাকার মধ্যে। এরই মধ্যে বেড়েছে খোলা তেলের দাম। বাজারে খোলা সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ১৮৫ থেকে ১৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খোলা পাম তেলের দাম প্রতি লিটার ১৬৫ থেকে ১৭০ টাকা।
গত একমাসে বোতলের সয়াবিন তেলের দাম স্থির থাকলেও খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, ফের বাড়ানোর পাঁয়তারা চলছে। তাই দোকানে যোগান কমিয়ে দিয়েছে।
বর্তমানে প্রতি লিটার ২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে বোতলজাত সয়াবিন তেল।
শনিবার রাতে মোহাম্মদপুরের ডেইলি নিডস-এ খুঁজে এক লিটারের সয়াবিন তেলের বোতল পাওয়া যায়নি। খুচরা দোকানেও মিলছিল না। পরে বড় একটি দোকান থেকে কেনার কথা বলেছেন এক ক্রেতা।
গত মাসে খামারের ডিমের ডজন ১২৫ থেকে ১৩০ টাকার মধ্যে ছিল। বর্তমানে তা কিনতে ভোক্তাকে গুনতে হচ্ছে ১৫৫ থেকে ১৬০ টাক। প্রতি কেজি মুরগির (ব্রয়লার) দাম ১৯০ থেকে ২০০ টাকার মধ্যে উঠানামা করছে।
গত মাসে প্রতি কেজি ৪০০ কাছাকাছি চলে যাওয়া কাঁচামরিচ আমদানির কারণে দাম নিচের দিকে রয়েছে।
বাজারে সরবরাহ বাড়ায় গত এক সপ্তাহে ধরে কিছু সবজির দামও নিম্নমুখী। তবে এর আগে বেশিরভাগ সবজির দাম ছিল ৮০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে।
স্বস্তি কী মিলবে?
অর্থনীতিবিদদের মতে, জীবনযাত্রার ব্যয়ে জনগণকে স্বস্তি দেওয়ার দুটো উপায়। এক. আয় বাড়ানো। দুই. পণ্য ও সেবার মান ধরে রেখে দাম কমানো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, “যদি জিনিসপত্রের দাম কমে, তাহলে আপনার ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে। আবার যদি আপনার আয় বাড়ে, তাহলেও আপনার ক্রয়ক্ষমতা বাড়তে পারে।
“সুতরাং সরকারের দু’দিকেই প্রচেষ্টা থাকতে হবে। একদিকে যেমন জিনিসপত্রের দাম ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার জন্য প্রচেষ্টা করা, অর্থাৎ মূল্যস্ফীতিটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তো সেটা করলে, আপনার মানুষের মোটামুটি একটু স্বস্তি আসবে, ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে।”
এর পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
“কর্মসংস্থান মানে যেটাকে আমরা বলি ‘ডিসেন্ট ওয়ার্ক’। অর্থাৎ যেখানটায় আপনার মজুরি ভাল। সঠিক বেতনটা পাওয়া যায়। এই ধরনের প্রচেষ্টা যদি করা যায়। অর্থাৎ মানুষের এই দুইটা কাজ একই সঙ্গে পেতে হবে-তখন স্বস্তিটা হবে মানুষের। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে।”
এই দুটোর উপায়ের ‘সমন্বয় সাধনের’ পরামর্শ দেন এ অর্থনীতিবিদ।
তবে এক্ষেত্রে মূল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে জ্বালানি সংকট। সাম্প্রতিক সময়ের জ্বালানি সংকটে কর্মসংস্থান বাড়ার বিপরীতে উল্টো একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর আসছে প্রতিনিয়ত। অনেক কর্মী ছাঁটাইয়ের কবলে পড়ছেন।
ফিলিং স্টেশনে গ্যাস মিলছে না, অটোরিকশা চললেও বেশি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা।
মোস্তাফা কে মুজেরী বলেন, “জ্বালানি সমস্যা যদি থাকে, তাহলে তো সবকিছুর মূল সমাধান একটাই-জ্বালানি সমস্যাটার সমাধান করা। জ্বালানি নিরাপত্তা যেটা বলা যায় এক কথায়।
“জ্বালানি নিরাপত্তা যদি নিশ্চিত করা না যায় তাহলে তো আপনার কর্মসংস্থান বলেন, আয় বৃদ্ধি বলেন বা জিনিসপত্রের মূল্য হ্রাস করার কথা বলেন, কোনোটা অর্জন করা সম্ভবপর হবে না।”
তবে বর্তমান বাস্তবতায় জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফেরাতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বা খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো অবস্থা সরকারের নেই বলে মনে করছেন আরেক অর্থনীতিবিদ কে এ এস মুর্শিদ।
এর ব্যাখায় তিনি বলেন, প্রাকৃতিক কারণে হোক বা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে হোক, খাদ্য ও জ্বালানির ‘রিজার্ভ’ নেই দেশে।
বিআইডিএসের সাবেক এই মহাপরিচালকের ভাষ্য, “আমাদের তো আসলে কোনো বাফার নাই। কোনো রিজার্ভ সে অর্থে নাই। তো এক্ষেত্রে আমাদের কিছু জায়গা আছে ‘অত্যন্ত ভালনারেবল’, রিস্কি জায়গাগুলোতে আমাদের খুব সাবধানে চলতে হয়, যেমন খাদ্য।
“খাদ্য নিরাপত্তার জন্য আমাদের গুদামে চাল রাখতে হয়। সরকারি গুদামে। সারের জন্যও একই। একেকটি জিনিস আছে, যেগুলো আমাদের সিকিউরিটির জন্য রিজার্ভ প্রয়োজন। জ্বালানির জন্যও একই।”
প্রতিবার যখন বৈশ্বিক বা দেশীয় সরবরাহে সমস্যা বা সংকট দেখা দেয় তখন পরিস্থিতি সামলানোর মতো উপায় থাকে না, বলেন এ অর্থনীতিবিদ।
