দিনাজপুরে ‘মাদকবিরোধী আন্দোলনের’ নামে পিটুনি ও লুটপাটের অভিযোগ

দিনাজপুরের বিরামপুরে মাদক কারবারের অভিযোগে এক নারীকে পেটানো হচ্ছে। গতকাল বিকেলে বিরামপুর পৌর শহরের চকপাড়া মহল্লায়ছবি: প্রথম আলো

দিনাজপুরের বিরামপুরে মাদকবিরোধী আন্দোলনের নামে মাদক কারবারিদের মারধর, বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে।

গতকাল রোববার বিকেল ৫টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের বিরামপুর পৌর শাখার উদ্যোগে পৌর শহরের ২ নম্বর ওয়ার্ডের কল্যাণপুর, চকপাড়া ও হঠাৎপাড়া এলাকায় অন্তত ১০টি বাড়িতে এমন ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিএনপির বিরামপুর পৌর শাখার সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিমের নেতৃত্বে এই মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালিত হয়। এ সময় মহিলা দলের বিরামপুর পৌর শাখার সদস্যসচিব তানজিদ মুন, যুগ্ম আহ্বায়ক পপি আক্তার, স্বেচ্ছাসেবক দলের পৌর শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক ছানোয়ার হোসেনসহ স্থানীয় দুই শতাধিক নারী-পুরুষ এতে অংশ নেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গতকাল বিকেলে কল্যাণপুর ঠাকুরের মোড় থেকে জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের ব্যানারে একটি লাঠিমিছিল বের করা হয়। পরে মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা লাঠি হাতে ওই এলাকার কথিত মাদক কারবারি রিয়াজুল ইসলাম এবং তাঁর দুই ছেলের বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর চালান। এরপর তাঁরা একই এলাকার ইকবাল চৌধুরী ও তাঁর দুই ছেলে রেজুয়ান ইসলাম ও রনির বাড়ি, চকপাড়ার মনোয়ারা বেগম, মনোয়ারা খাতুন, শামসুন্নাহার বেগম ওরফে পাতানি ও শাহানাজ পারভীনের বাড়িতে হামলা চালিয়ে দরজা, আলমারি, শোকেস, চেয়ার-টেবিল, টেলিভিশন, ফ্রিজসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র ভাঙচুর করেন।

অনেকের বাড়িঘরে ঢুকে ভাঙচুর চালানো হয়ছবি: প্রথম আলো

এ সময় শামসুন্নাহার বেগম, সুখীমণি ও তাঁর শাশুড়ি আফরোজা বেগমকে পিটুনি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। পরে তাঁরা বিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন।

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অভিযোগ, হামলার সময় বাড়ির মূল্যবান আসবাবপত্র, নগদ অর্থ ও স্বর্ণালংকার লুট করা হয়েছে।

পিটুনির শিকার শামসুন্নাহার বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা যদি কোনো অপরাধ করে থাকি, তাহলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আদালত আছেস। কিন্তু কেউ আমাদের এভাবে মারধর করতে পারে না। কোনো প্রমাণ ছাড়াই আমাকে মারধর করে স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছে। ব্যাটাছেলেরা আমার চুল ধরে মারছে, আমার শরীরে হাত দিয়েছে। আমার বাড়ির জিনিসপত্রও ভাঙচুর ও লুট করা হয়েছে।’

অভিযোগ আছে, ভাঙচুরের পর জিনিসপত্র লুটপাট করা হয়েছেছবি: প্রথম আলো

শাহানাজ পারভীনের দাবি, ‘আমি গরুর ব্যবসা করি। বাড়ির শোকেসে গরু বিক্রির দুই লাখ টাকা ও স্বর্ণালংকার ছিল। সব নিয়ে গেছে। ঘরের শোকেস, ড্রেসিং টেবিল, খাট, টেলিভিশনসহ সবকিছু ভেঙে ফেলা হয়েছে।’

তবে লুট ও মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করে মহিলা দলের বিরামপুর পৌর শাখার সদস্যসচিব তানজিদ মুন বলেন, ‘দেশকে মাদকমুক্ত করার লক্ষ্যেই আমরা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে মাঠে নেমেছি। আমরা মাদক কারবারিদের প্রতিরোধের চেষ্টা করেছি।’

বিএনপির বিরামপুর পৌর শাখার সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম বলেন, ‘এর আগে আমরা সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করেছিলাম এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছিলাম। দীর্ঘদিন ধরে তাদের কাছ থেকে হুমকি পাওয়া যাচ্ছিল। মহিলা দলের নেতৃত্বে পরিচালিত এই অভিযানের মাধ্যমে মাদক ব্যবসা নিরুৎসাহিত হবে বলে আমরা মনে করি।’

হামলার আগে জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের বিরামপুর পৌর শাখার উদ্যোগে মাদক প্রতিরোধ আন্দোলন কর্মসূচিছবি: প্রথম আলো

এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত শাহানাজ পারভীন, শামসুন্নাহার বেগম ও শেফালী বেগম গতকাল রাতে বিরামপুর থানায় তিনটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগে বিএনপি, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও মহিলা দলের কয়েকজন নেতা–কর্মীর পাশাপাশি স্থানীয় তিন সাংবাদিকসহ মোট ২২ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে আছেন বিরামপুর পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম, স্বেচ্ছাসেবক দলের বিরামপুর পৌর শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক ছানোয়ার হোসেন, যুবদলের পৌর শাখার সদস্যসচিব পলাশ বিন আশরাফী, মহিলা দলের বিরামপুর পৌর শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক পপি আক্তার প্রমুখ।

ঘটনাস্থল থেকে থানা কাছে। তারপরও পুলিশ যায়নি বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ। এ বিষয়ে বিরামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়নি, এমন নয়। তবে বিষয়টি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ আমাদের কাছে তখন পৌঁছায়নি। তিনজন নারী আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন বলে জেনেছি।’ লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান তিনি।

Facebook
X
LinkedIn
Telegram
WhatsApp
Email