এআই দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছবি, এনসিপি নেতাদের নামে অপতথ্য: ছাত্রদলের ভুয়া পরিচয়ে চলা এক পেজের উপাখ্যান

অন্য নারীর ছবি চুরি করে নিজের পরিচয়ে ব্যবহার, অস্তিত্বহীন পেশাগত ও রাজনৈতিক পরিচয় দাবি, আর সেই পরিচয়ের আড়ালে এআই দিয়ে বানানো ছবি ও ভুয়া সংবাদ ছড়িয়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের টার্গেট করা—‘Sayma Mahi’ নামের একটি ফেসবুক পেজের কার্যক্রমে এমন একটি ধারাবাহিক প্যাটার্নের সন্ধান পেয়েছে রিউমর স্ক্যানার। সাম্প্রতিক সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ এনসিপির একাধিক নেতাদের টার্গেট করে এআই-নির্মিত ছবি ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট ছড়াতেও দেখা গেছে পেজটিতে।

অন্য নারীর ছবিকে নিজের দাবি করে প্রচার

Sayma Mahi নামের পেজটি চালু হয় ২০২৪ সালের ২১ অক্টোবর। বাংলাদেশ থেকে চারটি আইডি থেকে পেজটি ম্যানেজ করা হচ্ছে। চালুর দিনই প্রোফাইল ছবি হিসেবে যে নারীর ছবি দেওয়া হয় তার একই পোশাক এবং একই স্থানের ছবি এর আগে থেকেই বিভিন্ন প্রোফাইলে পাওয়া যাচ্ছে। পরদিন (২২ অক্টোবর) প্রোফাইল ছবিতে যে নারীর ছবি দেওয়া হয় সেটি রিভার্স সার্চ করে সে বছরের ১৩ মে Tasmi Jahan Richi নামের একটি ভেরিফাইড প্রোফাইলে পাওয়া যায়। এরপর থেকে নিয়মিতই রিচির ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইলে ছবি পেজটিতে পোস্ট করা হচ্ছে নিজের নামে। অ্যালবাম আকারে সর্বশেষ প্রকাশ করা গুচ্ছ ছবিগুলোও রিচির ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইল থেকে সংগ্রহ করা।

গত ১৪ সেপ্টেম্বর সর্বশেষ প্রোফাইল ছবি পরিবর্তন করে পেজটি। ছবিটির ক্যাপশনে দাবি করা হয়, “এই বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে আয়োজিত একটি আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখার সুযোগ পেয়েছিলাম; মানবাধিকার বিষয়ক একটি সংগঠনের গর্বিত সদস্য হিসেবে আমি সেখানে অংশ নিয়েছিলাম।” কিন্তু যাচাই করে দেখা যাচ্ছে, ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি।

ছাত্রদলের নামে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার

পেজটির পরিচিতি অংশে নিজের দুইটি পরিচয় উল্লেখ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার সদস্য ও বিডি ট্যুর এন্ড ট্রাভেলস এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

কিন্তু আন্তর্জাতিক কোন মানবাধিকার সংস্থার সদস্য তা উল্লেখ করা হয়নি। অন্যদিকে, বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড কর্তৃক বৈধ নিবন্ধন থাকা প্রতিষ্ঠান বিডি ট্যুর এন্ড ট্রাভেলসে খোঁজ নিয়ে রিউমর স্ক্যানার জানতে পেরেছে, সায়মা মাহি নামে ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে কোনো ব্যক্তি তাদের প্রতিষ্ঠানে নেই। ফেসবুকে তাদের কোনো পেজও নেই বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

এসব পরিচয়ের বাইরে সম্প্রতি ছাত্রদলের অন্তত তিনটি পরিচয় ব্যবহার করা হয়েছে। পেজটির এক পোস্টে ছাত্রদলের সদস্য, দুইটি পোস্টে (১, ২) রাজধানীর মিরপুরের সরকারি বাঙলা কলেজ ছাত্রদলের সাবেক সহ-সভাপতি এবং Bongo Defence নামের একটি পেজে উক্ত পেজ থেকে দুইটি (১, ২) বক্তব্যের ফটোকার্ডে ‘ছাত্রদলের সাবেক সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক’ পরিচয় ব্যবহার করা হয়েছে।

রিউমর স্ক্যানার পৃথকভাবে যাচাই করে এবং ছাত্রদলের একাধিক সংশ্লিষ্ট নেতৃবৃন্দের সাথে আলাপ করে জেনেছে, এই তিন পরিচয়ের কোনোটিই সঠিক নয়। সায়মা মাহি নামে কোনো ব্যক্তি ছাত্রদলের উল্লিখিত ইউনিটের কমিটিতে ছিলেন না।

প্রধানমন্ত্রীর সাথে সম্পাদিত ছবি প্রচার

পেজটির কাভার ফটোতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে সচিবালয়ে তার কার্যালয়ে হাত মেলানোর একটি ছবি প্রকাশ করা হয়েছে। রিউমর স্ক্যানার যাচাই করে দেখেছে, ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি। গত ১০ আগস্ট তারেক রহমানের সাথে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী সাক্ষাৎ করেন। সে সময়ে তোলা একটি ছবিকে কাজে লাগিয়ে এআই দিয়ে এই ভুয়া ছবি বানানো হয়েছে৷

টার্গেট এনসিপি নেতৃবৃন্দ

আলোচিত পেজটি অন্তত গত ০৯ সেপ্টেম্বর থেকে এআই কনটেন্টের ব্যবহার করে বিভিন্ন ছবি প্রকাশ করতে শুরু করে। গত ১৪ সেপ্টেম্বর পেজটির এক পোস্টে দাবি করা হয়, “আসিফ মাহমুদের দুর্নীতির অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। সুইচ কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি অবহিত করেছেন, এবং দুর্নীতি রোধে সরকারের সাথে কাজ করতে আগ্রহী আন্তর্জাতিক মহল।” যদিও দুদক শুধু অভিযোগ হিসেবেই সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করেছিল। একইদিন আরেক পোস্টে দাবি করা হয়, “ক্ষমতায় থাকাকালীন ক্ষমতার অপব্যবহার করে একজন অভিনেত্রীর সাথে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে ছিলেন শিশু উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ।”

১৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন এর প্রিন্ট সংস্করণের মতো একটি ছবি পোস্ট করা হয়। এতে একটি সংবাদ দেখা যাচ্ছে, যার শিরোনাম, ‘আসিফ মাহমুদ আমাকে নক করেছিলেন, তখন তিনি উপদেষ্টা ছিলেন, এবং আমাকে নিয়ে দেশের বাইরে ঘুরতে চেয়েছিলেন, আমি বিষয়টিকে গুরুত্ব দেইনি,, চিত্রনায়িকা পরীমনি।’ রিউমর স্ক্যানার চ্যাটজিপিটির ওপেন এআই টুল দিয়ে যাচাই করে দেখেছে, কথিত এই সংবাদ সংবলিত ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি। বাংলাদেশ প্রতিদিনও এমন কোনো সংবাদ প্রকাশ করেনি।

পেজটি থাকা আজ (১৭ সেপ্টেম্বর) নতুন করে আরেক অভিনেত্রী সাফা কবিরকে জড়িয়ে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার নামে দুইটি পোস্ট করা হয়েছে। প্রথমটিতে দাবি করা হয়, সাফা কবিরকে নিয়ে থাইল্যান্ডে গিয়েছিলেন শিশু উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ। এই দাবিটি ছাত্রদল নেত্রীর বক্তব্য হিসেবে ইতোমধ্যেই ছড়াতে (১, ২) শুরু করেছে বিভিন্ন পেজ-গ্রুপে। প্রচার হয়েছে গণমাধ্যমেও (দ্য নিউজ)।

দ্বিতীয়টিতে, আসিফের সাথে সাফা কবিরের একটি ছবি প্রচার করা হয়েছে। সাফার সাথে আসিফের এমন ছবি নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্রে পাওয়া যায়নি। এআই টুলগুলো এটিকে এআই ছবি হিসেবে শনাক্ত করেছে।

আসিফের পর পেজটি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে নিয়ে দুইটি পোস্ট করেছে। এর একটিতে জাতীয় দৈনিক প্রথম আলোর প্রিন্ট সংস্করণের মতো একটি ছবিতে থাকা একটি সংবাদ দেখা যাচ্ছে, যার শিরোনাম, ‘রুকাইয়া আক্তার রিংকি হত্যা, বিয়ের আশ্বাসে প্রেম, পরে হত্যা; নাসির উদ্দিন পাটোয়ারীর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ’। আরেক পোস্টে একই রকম একটি প্রিন্ট সংবাদের ছবি দেখা যাচ্ছে, যাতে শিরোনাম, ‘রুকাইয়া আক্তার রিংকি হত্যাকাণ্ড: তদন্ত ও ন্যায়বিচারের দাবি পরিবারের’। যাচাই করে দেখা যায়, প্রথম আলো এমন কোনো সংবাদ প্রকাশ করেনি। চ্যাটজিপিটির ওপেন এআই টুলসের মাধ্যমে যাচাই করে দেখা যায়, ছবি দুইটি এআই দিয়ে তৈরি এবং এগুলোতে ওপেন এআই থেকে জেনারেট হওয়া সিন্থআইডির ওয়াটারমার্কেরও অস্তিত্ব রয়েছে।

পেজটির সাম্প্রতিক এমন কার্যক্রমগুলোর আগে বিগত সময়ে রাজনৈতিক প্রচারণামূলক নানা পোস্টের মধ্যে কতিপয় পোস্টে অপতথ্যের প্রচারও দেখা গেছে। গত এপ্রিলে ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম ও ঢাবি শিক্ষিকা শেহরীন আমিন ভুঁইয়া মোনামীর ভুয়া আপত্তিকর ছবি, জানুয়ারিতে ফাতেমাকে বোনের স্বীকৃতি দেওয়ার ভুয়া দাবিতে এআই ছবি প্রচার করা হয় পেজটি থেকে।

পেজটিতে অন্তত গত বছরের মে মাস থেকে বিএনপির পক্ষে প্রচারণা চালাতে দেখা গেছে। গেল ডিসেম্বরে শহীদ শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যুতে ব্যথিত হওয়ার পোস্ট দিতে দেখা গেছে পেজটি থেকে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের নেতাদের পক্ষেও পোস্ট করতে দেখা যায় পেজটিতে।

‘Sayma Mahi’ পেজটির কার্যক্রম বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভুয়া ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহারের পাশাপাশি অন্যের ছবি এবং এআই দিয়ে তৈরি কনটেন্টকে বাস্তব পরিচয় ও ঘটনার অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে এনসিপির নেতাদের জড়িয়ে ভুয়া সংবাদ, বক্তব্য ও ছবি প্রচারের মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর বয়ান তৈরির প্রবণতা দেখা গেছে। একই পেজে এর আগে বিএনপি ও ছাত্রদলের পক্ষে প্রচারণামূলক কনটেন্টও পাওয়া গেছে। ফলে পেজটির বিভিন্ন সময়ে ব্যবহৃত পরিচয় ও রাজনৈতিক বয়ানের মধ্যে পরিবর্তন থাকলেও ভুয়া পরিচয় এবং কৃত্রিমভাবে তৈরি কনটেন্ট ব্যবহারের প্রবণতা ধারাবাহিকভাবে দৃশ্যমান।

Facebook
X
LinkedIn
Telegram
WhatsApp
Email