সংগঠনের নিজস্ব সিদ্ধান্ত, হলের অন্যান্য ছাত্রসংগঠন ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতামত উপেক্ষা করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ হলের প্রাধ্যক্ষ কার্যালয়ে ফের তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে হল ছাত্রদলের সভাপতি ফিরোজ আহমেদ পাপনের বিরুদ্ধে। প্রাধ্যক্ষ ও সহকারী প্রক্টরের উপস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের নানা সমস্যার ইতিবাচক সমাধানের আশ্বাসের পরও ব্যক্তিগত স্বার্থে এই তালা দেওয়ার ঘটনা ঘটে মর্মে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে একদিকে প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা ও শিক্ষার্থীদের ফর্ম পূরণসহ নানা কাজে চরম ভোগান্তি তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে ছাত্রদলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও তীব্র ক্ষোভ ও বাকবিতণ্ডার সৃষ্টি হয়েছে।
জানা যায়, হলের অভ্যন্তরীণ কিছু বিষয় নিয়ে অসন্তোষের জেরে গত পরশু প্রথম দফায় প্রাধ্যক্ষ কার্যালয়ে তালা লাগান হল ছাত্রদল সভাপতি ফিরোজ আহমেদ পাপন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গতকাল রাত ১০টায় প্রাধ্যক্ষ কার্যালয়ে এক জরুরি বৈঠকের আয়োজন করা হয়। বৈঠকে হলের সার্বিক সমস্যা নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতারা প্রাধ্যক্ষের কাছে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দাবি তুলে ধরেন। প্রাধ্যক্ষও দাবিগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের আশ্বাস দেন। এই বৈঠকে হল ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদকসহ অন্যান্য নেতাকর্মী, বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
তবে বৈঠক শুরুর আগেই জটিলতা তৈরি করেন হল সভাপতি পাপন। প্রাধ্যক্ষ কার্যালয়ের তালা না খুলে গেস্টরুমে সভা করার প্রস্তাব দেন তিনি। কিন্তু তার দলের অন্যান্য নেতারা সেই প্রস্তাবে সম্মতি না দিয়ে প্রাধ্যক্ষ কার্যালয়ের তালা খুলে সেখানেই সভার ব্যবস্থা করেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে বৈঠকের একপর্যায়ে পাপন রাগ করে সভা থেকে বেরিয়ে যান।
পরবর্তীতে বৈঠক শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হলেও, কয়েকজন জুনিয়র অনুসারীকে সাথে নিয়ে ফের প্রাধ্যক্ষ কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেন পাপন। সভার সিদ্ধান্ত ও দলের অবস্থান অমান্য করে বারবার তালা দেওয়ার এই ঘটনায় একপর্যায়ে নিজস্ব দলীয় নেতাকর্মীদের সাথেই পাপনের তীব্র বাকবিতণ্ডা ঘটে।
ঘটনার বিষয়ে তাজউদ্দীন আহমদ হল ছাত্রদলের এক নেতা বলেন, ‘ছাত্রদলের জাবি শাখার সভাপতি-সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলামের নির্দেশনা এবং হলের অন্য নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতামত উপেক্ষা করে পাপন এককভাবে প্রভোস্টের কক্ষে তালা দিয়েছেন। প্রশাসনের প্রতিনিধি সহকারী প্রক্টর ড. আব্দুস সাত্তার ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে হলের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হওয়ার পর সবাই চলে গেলে তিনি পুনরায় কক্ষে তালা দেন।’
৫০তম আবর্তনের শিক্ষার্থী ও ছাত্রশক্তি নেতা রিয়াজুল রিয়াজ বলেন, ‘হলের সমস্যা সমাধানে আলোচনার বিকল্প নেই। প্রভোস্ট ও সহকারী প্রক্টরের উপস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রায় দুই ঘণ্টা বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু পাপন আলোচনায় উপস্থিত না থেকে প্রভোস্টের কক্ষে তালা দিয়ে রাখেন। পরে আলোচনা শেষে আমরা বের হওয়ার পর আবারও কক্ষে তালা দেওয়া হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘হল কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। হলের কোনো বিষয়ে এককভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কারও নেই। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা না করে প্রভোস্টের কক্ষে তালা দেওয়ার এখতিয়ারও কারও নেই। হলের প্রভোস্ট হিসেবে এলাহী স্যার থাকবেন কি থাকবেন না—এটা ডিসাইড করবে হলের শিক্ষার্থীরা, কোনো একক ব্যক্তি নয়। আপনি আপনার কোনো রাজনৈতিক বড় ভাইয়ের দেওয়া অ্যাসাইনমেন্ট হিসেবে হল প্রভোস্টকে ফেলে দিতে চাইবেন আর শিক্ষার্থীরা আপনাকে সমর্থন দেবে—এমনটা আশা করা বোকামি।’
এ বিষয়ে তাজউদ্দীন হল ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হাসান বলেন, ‘গতকাল আমরা শিক্ষার্থীরা স্যারকে অনেক দাবি জানিয়েছি এবং স্যার সেগুলো দ্রুত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু পরবর্তীতে আবার হল অফিসে তালা দেওয়াটা একদমই ঠিক হয়নি। এতে অনেক শিক্ষার্থীকে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে; অনেকে ফর্ম ফিলাপের জন্য সাইন করাতে পারছে না। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল সবসময় শিক্ষার্থীবান্ধব কাজ করে যাচ্ছে, শিক্ষার্থীদের সমস্যা হয় এমন কাজ কখনোই জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল বরদাস্ত করবে না।’
সার্বিক বিষয়ে জাবি শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক জহির উদ্দীন মোহাম্মদ বাবর বলেন, ‘তাজউদ্দীন হলের এই বিষয়টা অবগত হওয়ার পর আমরা কেন্দ্রীয় সংসদের সাথে কথা বলেছি এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সাথে কথা বলে সমাধান করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু এরপরও যারা সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের বাইরে অবস্থান নিয়ে এমন ঘটনা ঘটিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আমরা কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’
