মধ্যরাতে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটি

রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে লুটপাট করে গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে। মিরপুর, ঢাকা, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ছবি: জাহিদুল করিম

নিরাপত্তাকর্মীদের বেঁধে রেখে মধ্যরাতে রাজধানীর মিরপুর ১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়েছে। মুখোশ পরা দুই শতাধিক ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সেখানে ঢুকে প্রথমে দুই নিরাপত্তাকর্মীকে জিম্মি করে। এরপর মূল্যবান যন্ত্রপাতি, ওষুধ, ভ্যাকসিন, নগদ টাকা ও অন্যান্য মালপত্র লুট করে নিয়ে যায়। পরে ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে একটি পাকা ও তিনটি আধা পাকা ভবনসহ পুরো স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।

বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে এই ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে এ ভাঙচুর চালানো হয়েছে। এতে এক কোটি টাকার বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছেন রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার। এ ঘটনায় বাদী হয়ে শাহ আলী থানায় মামলা করেছেন তিনি।

স্থানীয় বিএনপির দুটি পক্ষ দীর্ঘদিন ধরে জায়গাটি দখল করার চেষ্টা করে আসছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে একটি পক্ষ ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামে তা দখল করে নিয়েছে। স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য বিএনপি নেতা ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি এই পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন। তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক। প্রয়াত এক কাউন্সিলরের স্ত্রী এবং বিএনপির প্রয়াত একজন এমপির বোন তিনি।

স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, হামলা ও ভাঙচুরের সময় পুলিশকে খবর দিয়েছিলেন তাঁরা। পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলেও স্থাপনাটি রক্ষা করতে পারেনি। পুরো ভবনটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে শাহ আলী থানা-পুলিশ বলছে, মামলা হলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আজ শুক্রবার দুপুরে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, মিরপুর ১ নম্বর–সংলগ্ন মুক্তিযোদ্ধা মার্কেট ও ফেয়ার প্লাজা মার্কেটের মাঝের অংশে রাড্ডা এমসিএইচ–এফপি টিকাদান কেন্দ্র অবস্থিত। কেন্দ্রের মূল ফটক তালাবদ্ধ। বাঁশ, খুঁটিসহ কিছু নির্মাণসামগ্রী পড়ে আছে। ফটকের ওপরে একটি সাইনবোর্ড। তাতে লেখা রয়েছে, ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ থেকে বরাদ্দ পাওয়া ও রেজিস্ট্রি মূলে এই প্লটের মালিক সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড। জমির পরিমাণ ১০ কাঠা।’

পরে পাশের একটি গলি দিয়ে টিকাদান কেন্দ্রের পেছনের অংশে গিয়ে দেখা যায়, কেন্দ্রের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে ফেলা হয়েছে। পাশাপাশি তিনটি পাকা ও আধা পাকা ভবন ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। পলেস্তারা, বাঁশ, খুঁটিসহ নির্মাণসামগ্রী ভেঙে পড়ে আছে। ভবনের কক্ষগুলোর দরজা–জানালা খুলে ফেলা হয়েছে। কয়েকটি কক্ষে দরজা থাকলেও তাতে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। কক্ষের ভেতরে থাকা আসবাবপত্র, ওষুধ, ভ্যাকসিন, ক্যাপসুল মেঝেতে পড়ে আছে। স্থাপনার এক কোনায় একটি বড় আমগাছ রয়েছে। তবে গাছের একাধিক ডাল কেটে ফেলে রাখা হয়েছে। উৎসুক লোকজন জড়ো হয়ে তা দেখছেন।

টিকাদান কেন্দ্রের পাশের এক দোকানি নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, ‘রাত ১০টায় দোকান বন্ধ করে বাসায় যান তিনি। সকালে এসে দেখেন কিছুই নেই। অল্প খরচে গরিব মানুষেরা এখান থেকে টিকা দিতে পারত। অথচ এখন দেখে মনে হচ্ছে ধ্বংসস্তূপ। যারাই করুক, কাজটি ভালো করে নাই।’

রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার ১৯৭৪ সালে মিরপুরের সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্ন আয়ের মানুষের মাতৃ ও শিশুসেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যে কার্যক্রম শুরু করে। তৎকালীন সুইডিশ সেভ দ্য চিলড্রেনের প্রতিষ্ঠান রাড্ডা বার্নেনের উদ্যোগে কেন্দ্রটির যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি প্রজনন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা, গর্ভকালীন ও প্রসবোত্তর সেবা, শিশুদের টিকাদান, শিশু স্বাস্থ্যসেবা এবং কমিউনিটি স্বাস্থ্য কার্যক্রম পরিচালনা করে। কেন্দ্রটির তিনটি স্থায়ী ক্লিনিকে রোগীদের প্রয়োজন অনুযায়ী প্যাথলজি, বায়োকেমিস্ট্রি, হেমাটোলজিসহ বিভিন্ন পরীক্ষার সুবিধাও রয়েছে। মিরপুর ১০ এলাকায় প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কেন্দ্র হলেও মিরপুর ১, বাউনিয়াবাদ, উত্তরা, ভাসানটেক বস্তি ও পুরান ঢাকায় প্রতিষ্ঠানটির সেবা কার্যক্রম বিস্তৃত রয়েছে।

বিশিষ্ট শিল্পপতি ও ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান প্রতিষ্ঠানটির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন, এশিয়ার নোবেল হিসেবে খ্যাত র‍্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার পাওয়া প্রথম বাংলাদেশি নারী ও সমাজকর্মী তাহরুন্নেসা আবদুল্লাহ কোষাধ্যক্ষ হিসেবে রয়েছেন। এ ছাড়া সাবেক আমলা আবদুল মুয়ীদ চৌধুরী, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এ এস এম কাশেম, এ কে আজাদ এবং সাবেক সচিব আবদুল করিম ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য হিসেবে আছেন। প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও সাবেক সচিব কাজী ফজলুর রহমান, প্রখ্যাত গাইনি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক টি এ চৌধুরী, প্রকৌশলী অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী প্রতিষ্ঠানটির ট্রাস্টি বোর্ডে ছিলেন।

প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার বলেন, পাঁচ–ছয় বছর ধরে সমমনা সমবায় সমিতির নামে কিছু লোক জায়গাটি দখলের চেষ্টা করে আসছিল। ২০২২ সালেও একবার চেষ্টা হয়। কিন্তু সে সময় পারেনি। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে এসে সব গুঁড়িয়ে দিয়েছে। জমি দখলের উদ্দেশ্যেই এ হামলা করা হয়েছে।

ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় হওয়া মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে ২০০ থেকে ২৫০ জন মুখোশধারী ব্যক্তি দা, হাতুড়ি, লাঠিসোঁটা নিয়ে প্রাচীর টপকে ভেতরে ঢুকে পড়ে। টিকাদান কেন্দ্রে থাকা দুই নিরাপত্তাকর্মী আন্দ্রিয় সরকার ও আবদুল হাইকে মারধর করে। পরে তাঁদের একটা খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখে। পুরো ভবনটি দখলে নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রবেশে বাধা দেয়। একপর্যায়ে মূল ফটক ভেঙে ভবন ভাঙার ভারী মেশিন দিয়ে ভবনটির সব কটি কক্ষ ভাঙচুর করে। মামলায় হানিফ মিয়া (৫০) নামের এক ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। হানিফ মিয়া ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক সদস্য।

এজাহারে আরও বলা হয়, হামলাকারীরা সরকারি ইপিআই টিকা, টিকা প্রদানের সরকারি রেজিস্টার ও নথি, পরিবার পরিকল্পনার বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও উপকরণ, ওষুধ ও ভ্যাকসিন, দুটি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন, একটি জেনারেটর, দুটি কম্পিউটার, প্রিন্টার, তিনটি ফ্রিজ, তিনটি শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি), তিনটি স্টিলের আলমারি, সিসিটিভি ক্যামেরা, চেয়ার–টেবিল ও অন্যান্য আসবাব নিয়ে যায়। সব মিলিয়ে ১ কোটি ৯ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। যাওয়ার আগে দুর্বৃত্তরা দেয়ালে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যানার টানিয়ে দেয়।

আশপাশের লোকজন, স্থানীয় দোকানি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় বিএনপির দুটি পক্ষ জায়গাটি দখলের চেষ্টা করছিল। জায়গাটি নিয়ে মামলাও হয়। ফলে এত দিন কেউ দখল করতে পারছিল না। ২০২৬ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতির ব্যানারে আবার দখলের চেষ্টা হচ্ছিল। সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য বিএনপি নেতা ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি এই পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার রাতে প্রতিষ্ঠানটি ভেঙে জায়গাটি দখল করে নিয়েছে তারা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফেরদৌসী আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ভাঙচুরের ঘটনা তিনিও শুনেছেন। ব্যস্ততার কারণে যেতে পারেননি। সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতির সঙ্গে তাঁর নাম থাকলেও ভাঙচুরের সঙ্গে তিনি জড়িত নন। যেহেতু ভাঙচুরের মামলা হয়েছে, আইনগতভাবেই পুলিশ ঘটনার তদন্ত করে দেখুক।

রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার প্রায় ৫০ বছর ধরে সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে দরিদ্র, অসহায় নারী ও শিশুদের বিনা মূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রসূতি ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা দিয়ে আসছে বলে প্রথম আলোকে জানান নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার। তিনি বলেন, এটি এলাকার হাজারো মানুষের স্বাস্থ্যসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। সরকারের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে তাঁরা প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করে আসছেন। তিনি জানান, আগামীকাল থেকে সরকারি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা ছিল। তার আগেই প্রতিষ্ঠানটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর আলম প্রথম আলোকে বলেন, হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় মামলা হয়েছে। ঘটনার তদন্ত করে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

আরও সংবাদ

রাড্ডা ক্লিনিক ভাঙচুর: স্থানীয় বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতৃত্বেই করা হয় হামলা-লুটপাট

https://www.tbsnews.net/bangla/bangladesh/news-details-545106

https://web.archive.org/web/20260929042548/https://www.tbsnews.net/bangla/bangladesh/news-details-545106

মিরপুর বিভাগের ডিসি হাসান মোহাম্মদ নাছের টিবিএসকে বলেন, ‘তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিস্তারিত বলা সমীচিন হবে না।  ঘটনার সঙ্গে যারা সংশ্লিষ্ট, সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। আমরা কোনো চাপে নাই। এ ঘটনায় যারাই জড়িত সবাইকে গ্রেপ্তারের জন্য আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’

রাজধানীর মিরপুর-১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় বেরিয়ে এসেছে বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদল নেতাসহ আরও অনেকের নাম। এ পর্যন্ত ১২জন ধরা পরলেও হামলার পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দেওয়া অনেকেই এখনও আইনের আওতায় আসেনি।

সিসিটিভি ফুটেজ, স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হামলার আগে শাহ আলী থানার পাশে স্থানীয় বিএনপি ও ছাত্রদল নেতার অফিসের সামনে লোকজন জড়ো হয়। পরে তাদের একটি অংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দিকে যায়।

হামলার সময় ঘটনাস্থলের আশপাশে একটি সাদা মাইক্রোবাস এবং কয়েকটি মোটরসাইকেলের গতিবিধিও ওই এলাকার বিভিন্ন সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়ে।

দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের (টিবিএস) অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভাঙার জন্য ব্যবহৃত এক্সক্যাভেটরটি ভাড়া করা হয়েছিল আগেই।

ভেকুর (খননযন্ত্র) চালক ও মালিক জানিয়েছেন, ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি’র ক্যাশিয়ার শাহাদাত হোসেন এটির জন্য যোগাযোগ করেছিলেন। এরই মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন সেই শাহাদাত।

মিরপুর বিভাগের ডিসি হাসান মোহাম্মদ নাছের টিবিএসকে বলেন, ‘তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিস্তারিত বলা সমীচিন হবে না।  ঘটনার সঙ্গে যারা সংশ্লিষ্ট, সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। আমরা কোনো চাপে নেই। এ ঘটনায় যারাই জড়িত সবাইকে গ্রেপ্তারের জন্য আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’

হামলার আগে থানার সামনে জড়ো হয়েছিল লোকজন

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ২৫ সেপ্টেম্বর রাত ১২টা ৪ মিনিটের দিকে শাহ আলী থানার কাছাকাছি থানা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ ওরফে লেলিনের কার্যালয়ের সামনে একদল মানুষ জড়ো হয়।

প্রায় ৪৬ মিনিট পর, রাত ১২টা ৫০ মিনিটের দিকে জড়ো হওয়া ব্যক্তিদের স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দিকে এগিয়ে যেতে দেখা যায়।

অনুসন্ধানে ফুটেজে থাকা কয়েকজনের পরিচয়ও নিশ্চিত হয়েছে টিবিএস। ফুটেজে হলুদ টিশার্ট পরা যুবকের নাম আরিফ। তিনি শাহ আলী থানা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক। লাল টিশার্ট পরা শামীম এবং টুপি পরা হাসানও স্থানীয় সাবেক ছাত্রদল নেতা এবং সাবেক ছাত্রদল নেতা আবুল কালাম আজাদ ওরফে লেলিনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত।

আরেকটি সিসিটিভি ফুটেজে মামলার প্রধান আসামি বিএনপি নেতা হানিফ মিয়ার ছোট ভাই শামীমকেও ঘটনাস্থলে দেখা গেছে বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

হামলাকারীদের একটি অংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কাছাকাছি এলাকায় গিয়ে লাঠি, রামদা, হাতুড়িসহ দেশীয় অস্ত্র সংগ্রহ করে। এরপর কেউ কেউ মাথায় কাপড় ও মুখোশ বেঁধে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রবেশ করে।

ভাঙচুরের নেতৃত্বে শাহ আলী থানা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আওলাদ হোসেন ওরফে নাডা আওলাদ এবং ৯৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. ইলিয়াসের নাম এসেছে। এছাড়া আরাফাত নামের একজনের নাম আসলেও তার পরিচয় জানা যায়নি।

ভাঙচুর ও লুটপাটের সময় বাইরের পরিস্থিতি সামলানোর জন্য বুলু ও কবির ওরফে টাক্কু কবিরকে মোটরসাইকেলে টহল দিতে দেখা যায়।

সাদা মাইক্রোবাসে কারা ছিলেন?

ঘটনার সময় স্বাস্থ্যকেন্দ্রের আশপাশে একটি সাদা মাইক্রোবাস ঘুরতে দেখা যায়।

টিবিএসের হাতে আসা সিসি ক্যামেরার ফুটেজ ও অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ওই মাইক্রোবাসে ছিলেন হানিফ মিয়া, আবুল কালাম আজাদ ওরফে লেলিন এবং ঢাকা মহানগর যুবদলের সাবেক সদস্যসচিব মোস্তফা জগলুল পাশা ওরফে পাপেলসহ আরও কয়েকজন।

হামলা ও ভাঙচুরের সময় মাইক্রোবাসটি থেকে ঘটনাস্থলের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছিল বলে জানিয়েছে তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র।

হানিফ মিয়া, আবুল কালাম আজাদ ওরফে লেলিন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির ঘনিষ্ঠ হিসেবে এলাকায় পরিচিত। তাদের মধ্যে লেলিন ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সম্ভাব্য কাউন্সিলর প্রার্থী হিসেবে এলাকায় ব্যানার ও পোস্টার লাগিয়েছেন।

একই ওয়ার্ডে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির আত্মীয় হানিফও কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করতে আগ্রহী বলে স্থানীয়রা জানান।

পুলিশি তদন্ত দলের ধারণা ওই গাড়িতে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিও অবস্থান করছিলেন। তবে সিসি ক্যামেরার ফুটেজে তাকে দেখা যায়নি।

তবে মিষ্টি টিবিএসের কাছে হামলায় নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। কীভাবে এ ঘটনায় তার নাম আসলো, তিনি জানেন না বলে দাবি করেন।

তার বক্তব্য, ২০০৬ সালে ওয়ার্ড কমিশনার থাকাকালে সমিতির নামে জায়গা বরাদ্দের আবেদনপত্রে তার স্বাক্ষর ছিল; এরপর সমিতির সঙ্গে তার আর কোনো সম্পর্ক নেই।

লেলিন ও পাপেলের বক্তব্য জানতে তাদের ফোন করা হলেও পাওয়া যায়নি।

স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভাঙচুরের পরদিন সমমনা সমিতির পক্ষে হওয়া মানববন্ধনেও হানিফ অংশ নেন।

হানিফ মিয়া টিবিএসকে বলেন, ‘আমি এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নই। মামলায় আমার নাম কেন দেওয়া হলো জানি না।’

যদিও মিরপুরের ডিসি হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার আবু হানিফকে পলাতক উল্লেখ করে টিবিএসকে বলেন, ‘তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি মামলায় যাদের নাম নেই কিন্তু বিভিন্ন ফুটেজে ও অনুসন্ধানে পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে, সবাইকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’

ভেকু এল কোথা থেকে?

রাড্ডা ভাঙচুরের সময় সিসি ক্যামেরায় দেখা যাওয়া ভেকুটি মিরপুর বেড়িবাঁধ এলাকা থেকে ভাড়া করা হয়েছিল।

ভেকুর চালকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টার দিকে একটি ফোনে তাকে বলা হয়, একটি জায়গা থেকে মালামাল সরাতে হবে।

পরে জানানো হয়, সেখানে ভবন ভেঙে জায়গা পরিষ্কার করে দেওয়া হবে এবং সেখানে শপিংমল করা হবে। কিন্তু চালক ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি দেখে সন্দেহ করেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই চালক বলেন, সেখানে লোকজন জড়ো হতে দেখে তিনি ভেকুটি আর সামনে না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং সেখান থেকে চলে যান।

তিনি জানান, ভেকুটি ভাড়া করার জন্য যোগাযোগ করেছিলেন সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতির ক্যাশিয়ার শাহাদাত হোসেন।

প্রথম ভেকুটি ফিরে যাওয়ার পর শাহ আলী থানা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক মারুফ অন্য একটি ভেকু নিয়ে ঘটনাস্থলে যান। এ সময় তাকে সোলেমান নামে আরেকজন সহায়তা করেন। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মুখোশধারী লোকজন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রবেশ করে।

মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, হামলাকারীরা দুই নিরাপত্তাকর্মীকে জিম্মি করে। এরপর হ্যামার ও অন্যান্য সরঞ্জাম দিয়ে প্রধান ফটক ভাঙা হয়। একপর্যায়ে পরে আনা ভেকুটি দিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভবন ভাঙা শুরু হয়।

একটি পাকা ও তিনটি আধা-পাকা ভবনসহ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বিভিন্ন অংশ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ, টিকা, আসবাব ও অফিসের মালামালও লুট করা হয়।

ভবন ভাঙার পর সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর সাইনবোর্ড ও ব্যানার টাঙিয়ে দেওয়া হয়।

হামলার পর লুট করা মালামাল বিভিন্ন স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয় বলে তথ্য পাওয়া গেছে। সিসিটিভি ফুটেজের সূত্র ধরে কয়েকটি বাড়ির ঠিকানা শনাক্ত করে সেখানে খোঁজ নেওয়া হয়।

পুলিশ পরে দারুস সালাম থানার বেড়িবাঁধসংলগ্ন এলাকা থেকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের লুট হওয়া আসবাব, টিকা, রেজিস্টার, ফ্রিজ, অফিসের কাগজপত্র, প্রিন্টার, জেনারেটরসহ ৪৬ ধরনের মালামাল উদ্ধার করেছে। মালামাল বহনে ব্যবহৃত দুটি কাভার্ডভ্যানও আটক করা হয়েছে।

এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার হওয়া ১২ জন হলেন- মো. সোহেল, (২২), মো. জুয়েল, (২৩), জিহাদ হাসান (২১), মো. রাব্বি, (২০), শাহাদাত হোসেন (৩৩), কাজী মকবুল হোসেন (৫৮), শাহ আলম (৫৩), আতিকুর রহমান (৩৩), কামরুল ইসলাম (৫২), শাকিল (২০), মো. মিন্টু (৩৫) ও  মো. মিলন (৪৫)।

ধ্বংসস্তূপে এখনও দেওয়া হচ্ছে চিকিৎসাসেবা

একটি পাকা ও তিনটি আধা-পাকা ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়া হলেও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কর্মীরা ধ্বংসস্তূপের সামনে সীমিত পরিসরে চিকিৎসাসেবা ও টিকাদান চালিয়ে যাচ্ছেন।

স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি দীর্ঘদিন ধরে নিম্নআয়ের মানুষ, মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা, টিকাদান, পরিবার পরিকল্পনা ও অন্যান্য সেবা দিয়ে আসছিল। ভবন ধ্বংসের ফলে নিয়মিত আল্ট্রাসনোগ্রাম, পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হয়েছে।

সোমবার স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নিজস্ব সাইনবোর্ড আবার টাঙানো হয়েছে এবং সংস্কারের পাশাপাশি চিকিৎসাসেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার টিবিএসকে বলেন, ‘এখনও আমাদের শঙ্কা পুরোপুরি কাটেনি।  সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যে ভবিষ্যতে আমরা এখানে নিরবিচ্ছিন্নভাবে কাজ করতে পারব। সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতির মতো অন্য কোন দুষ্কৃতিকারী যেন এই ধরনের হামলা ভবিষ্যতে আর কখনো না করতে পারে সে বিষয়ে আমরা স্থায়ী সমাধান কামনা করছি সরকারের কাছে।’

Facebook
X
LinkedIn
Telegram
WhatsApp
Email