এআই দিয়ে ভুয়া চ্যাট ছড়িয়ে ফাঁদে নেতারা, ছাত্রদলের ৮ নেতাকে শোকজ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হেয় করার অভিযোগ উঠেছে সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলায়। ফতেপুর ইউনিয়ন ছাত্রদলের কয়েকজন নেতার কথিত হোয়াটসঅ্যাপ কথোপকথনের স্ক্রিনশট ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর এ ঘটনা সামনে আসে। এসব স্ক্রিনশটে নেতাদের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর ও দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী বক্তব্য তুলে ধরা হয়।

বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ার পর সিলেট জেলা ছাত্রদল গত সোমবার (১৯ অক্টোবর) ফতেপুর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ আট নেতাকর্মীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়। নোটিশে আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সশরীরে উপস্থিত হয়ে লিখিত জবাব দিতে বলা হয়েছে।

স্ক্রিনশটগুলো ভাইরাল হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান করে সিলেট স্থানীয় একটি ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠান। তাদের প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণে দাবি করা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কথিত হোয়াটসঅ্যাপ কথোপকথনগুলো বাস্তব নয়। বরং আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ছবিগুলো তৈরি করা হয়েছে।

অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষণে স্ক্রিনশটের ফ্রেমের গঠন, ফন্টের বিন্যাস ও ডিজিটাল প্যাটার্ন পরীক্ষা করা হয়। ফ্যাক্টচেক দলের দাবি, নেতাদের সামাজিকভাবে হেয় করা এবং তাঁদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে এসব ছবি তৈরি করে ছড়ানো হয়েছে। এর ফলে ফতেপুর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাংগঠনিক কার্যক্রমেও প্রভাব পড়েছে।

সিলেট জেলা ছাত্রদলের দেওয়া নোটিশে যাঁদের নাম রয়েছে, তাঁরা হলেন—ফতেপুর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি নাজিম উদ্দীন, সিনিয়র সহসভাপতি জামাল উদ্দীন, সহসভাপতি বেলাল আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক তোফায়েল আহমেদ হেলু, সহসাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম রব্বানী, নাজমুল ইসলাম মান্না, শাহরিয়াদ আহমদ ও নাজমুল হাসান নাইম।

নোটিশ অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাঁদের সশরীরে উপস্থিত হয়ে লিখিত জবাব দিতে হবে।

ঘটনাটিকে স্থানীয় একটি স্বার্থান্বেষী মহলের প্রযুক্তিনির্ভর ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেছেন ফতেপুর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি নাজিম উদ্দীন। তাঁর ভাষ্য, সীমান্তে চলা অবৈধ কর্মকাণ্ড এবং ফতেপুর বাজার দিয়ে নিয়মিত চলাচল করা পরিবহন সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যের বিরুদ্ধে এলাকায় জনমত গড়ে তোলায় একটি প্রভাবশালী চক্র তাঁদের ওপর ক্ষুব্ধ হয়।

নাজিম উদ্দীনের দাবি, স্থানীয় বিরোধের জেরে ওই চক্র তাঁদের প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার পাশাপাশি দলীয় পদ ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। সরাসরি বিরোধে সুবিধা করতে না পেরে চক্রটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিপফেক প্রযুক্তির সাহায্যে ভুয়া স্ক্রিনশট তৈরি করে। পরে ভুয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে সেগুলো ছড়িয়ে দেওয়া হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন। তাঁর মতে, এর উদ্দেশ্য দলকে বিভ্রান্ত করা এবং নেতাদের সাংগঠনিকভাবে দুর্বল করে দেওয়া।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, গোয়াইনঘাটের এ ঘটনা রাজনীতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহারের ঝুঁকি তুলে ধরেছে। ডিপফেক ও জেনারেটিভ এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সহজেই ভুয়া অডিও, ভিডিও কিংবা বার্তার স্ক্রিনশট তৈরি করে কাউকে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করা সম্ভব।

তাঁদের মতে, তৃণমূল রাজনীতিতে এ ধরনের প্রযুক্তির অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ভবিষ্যতে আরও অনেক নেতাকর্মী এমন অপপ্রচারের শিকার হতে পারেন। বিশেষ করে, কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই না করে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হলে নির্দোষ ব্যক্তিরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এখন সিলেট জেলা ছাত্রদলের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে নজর রয়েছে। আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে শোকজের জবাব দেওয়ার পর বিষয়টি কীভাবে মূল্যায়ন করা হয় এবং ভুয়া স্ক্রিনশট ছড়ানোর অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে কী উদ্যোগ নেওয়া হয়, তা দেখার বিষয়।

Facebook
X
LinkedIn
Telegram
WhatsApp
Email