নওগাঁর আত্রাইয়ে চাঁদা না পেয়ে ছাত্রদল নেতার নেতৃত্বে দলবেঁধে একটি ঔষধের দোকানে হামলা, ভাঙচুর ও ব্যবসাীকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া পুলিশের উপস্থিতিতে এই হামলা এবং পুলিশ নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে বলে ভুক্তভোগী ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন। হামলার সিসি টিভির ফুটেজ এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।
এরআগে সোমবার (২০ অক্টোবর) বিকেলে উপজেলার পতিসর বাজারে মুক্তি ফার্মেসীর স্বত্বাধিকারী ফিরোজ কবির ও তার ভাই একরামুল হকের ওপর এই হামলার ঘটনা ঘটে। এতে গুরুতর আহত হয় তারা। প্রকাশ্যে এমন হামলার ঘটনার পর থেকেই স্থানীয়দের মাঝে এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে। এদিকে হামলার ঘটনায় ওই ছাত্রদল নেতাসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আর ১০-১২ জনের নামে থানায় মামলা করা হয়েছে।
হামলাকারীরা ওই ছাত্রদল নেতার নাম রিফাত হোসেন। তিনি আত্রাই মোল্লা আজাদ মেমোরিয়াল সরকারি কলেজ শাখা ছাত্রদলের সভাপতি।
হাতে আসা সিসি টিভির ফুটেজে দেখা যায়- ফিরোজ কবির দোকানে একটি চেয়ারে বসা। এসময় তার দোকানের সামনে কয়েকজন ক্রেতা থাকলে তাদেরকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এর কিছুক্ষণের মধ্যে ছাত্রদল নেতার রিফাতসহ ৮-১০ জন পাইপ ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ভাঙচুর শুরু করেন।
এ সময় ফিরোজ কবির দোকানের ভেতরে চলে গেলে হামলাকারী কয়েকজন দোকানের ভেতরে গিয়ে তাকে মারধর করেন। তিনিও প্রতিহত করার চেষ্টা করেন। এক পর্যায়ে ফিরোজ দৌঁড়ে বাইরে চলে আসলে হামলাকারীরা দোকান থেকে বের হয়ে ফিরোজের ছোট ভাই একরামুলকেও মারধর করেন।
পরে হামলাকারীরা চলে যেতে চাইলে একজনকে আটক করে নিয়ে আসতে দেখা যায় স্থানীয়দের। এ সময় সিসিটিভির ফুটেজে আত্রাই থানার এএসআই মামুনুর রশিদ স্থানীয়দের কিছু একটা বলে দাঁড়িয়ে থাকেন। আরেক পুলিশ সদস্য ভিডিও মোবাইলে ধারন করছিলেন।
ভুক্তভোগীদের ভাই মাসুদুর রহমানের থানায় করা এজাহার সূত্রে জানা যায়, ভরতেঁতুলিয়া গ্রামের রিফাত হোসেন, রিংকু, আশিক ও গণ্ডগোয়ালি গ্রামের সাজু তাদের পূর্ব পরিচিত। সামাজিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ চলে আসছিল। এরই ধারাবাহিকতায় রিফাতের নেতৃত্বে সোমবার (২০ অক্টোবর) বিকেলে পতিসর বাজারে ঔষধের দোকানে গিয়ে ফিরোজ কবিরের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে।
এসময় চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে ১০-১২ জন দেশী অস্ত্র চাপাতি, লোহার রড দিয়ে অতর্কিত হামলা চালিয়ে ফিরোজ কবিরকে হত্যার উদ্দেশ্যে মারপিট করে। এসময় তার আরেক ভাই একরামুল হক বাঁধা দিলে তাকেও হত্যার উদ্দেশ্যে আঘাত করে। পরে স্থানীয়রা এগিয়ে এসে তাদের উদ্ধার করে চিকিৎসা দেন। এসময় আসামিরা সিসি ক্যামেরা ও কম্পিউটারসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র ভাঙচুর করেন। মারধর করে যাওয়ার সময় দোকানের ক্যাশবাক্স থেকে আড়াই লাখ টাকা নিয়ে চলে যান।
ভুক্তভোগী ফিরোজ কবির বলেন, ‘কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি রিফাত আমার কাছে বেশ কিছুদিন আগে থেকে চাঁদা দাবি করে আসছিলেন এবং মোবাইলে হুমকি-ধামকি দিতেন। চাঁদার টাকা না দেওয়ায় গত রবিবার (১৯ অক্টোবর) রাতে রিফাতসহ ১০-১২ জন ছেলে বাড়িতে এসে চাঁদার জন্য চাপ দেয়। এসময় গ্রামের লোকজন জড়ো হয়ে তাদের ঘেরাও করে। পরে পুলিশ নিয়ে এসে পুলিশের সহযোগিতায় তারা চলে যায়। পরের দিন সোমবার বিকেলে প্রতিদিনের মতো দোকানে কার্যক্রম চলছিল। আসরের নামাজ পড়ে আমি দোকানে আসি। এসময় রিফাতসহ ১০-১২ জন ছেলে দেশীয় অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে দোকানের ভেতর প্রবেশ করে ভাঙচুর ও আমাকে মারধর করে। এসময় স্থানীয়রা ক্ষিপ্ত হয়ে একজনকে আটক করে। ঘটনায় সময় দুইজন পুলিশ দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু তারা নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করে। তারা চেষ্টা করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন ‘ তিনি আরো বলেন, ‘ঘটনার পর আমরা থানায় গিয়ে চাঁদাবাজির মামলা দিতে চাইলে পুলিশ চাঁদাবাজি মামলা নিতে রাজি হয়না। পরবর্তীতে হত্যা চেষ্টা মামলা হয়।’
হামলার শিকার ফিরোজ কবিবের ভাই একরামুল হক বলেন, ‘বড় ভাইয়ের দোকানের পাশে আমার দোকান। আমার ভাইয়ের ওপর অতর্কিত হামলা দেখে প্রতিহত করার চেষ্টা করি। এসময় তারা আমার মাথায় আঘাত করে। মাথার দুই জায়গায় সেলাই দেওয়া হয়েছে। ঘটনার সময় দুই পুলিশ সদস্য উপস্থিত ছিল। আমরা ভাবছিলাম যে তারা আমাদের সহযোগিতা করবে, কিন্তু তারা সহযোগিতা না করে যখন একজনকে স্থানীয়রা আটক করলো তখন তারা ভিডিও করতেছিল আর তাদের গায়ে যেন কেউ হাত না দেয় বলতেছিলো।’
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘রাতেও হামলাকারীরা পুলিশ হেফাজতে চলে যায় এবং এখানেও পুলিশ সঙ্গে ছিল। তারা যে পুলিশি সহযোগিতায় আমাদের ওপর আক্রমণ করল আমরা এর সুষ্ঠ বিচার চাই।’
স্থানীয় ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম, হাফিজুর রহমান, সিরাজুল ইসলামসহ কয়েকজন বলেন, ‘মারধর করে যখন তারা পালিয়ে যাচ্ছিলেন তখন তাদের মধ্যে থেকে একজনকে ধরে স্থানীয়রা মারধর শুরু করলে ওই মুহূর্তে পুলিশ ভিডিও করছিলো। অথচ ঘটনার সময় পুলিশ থাকলেও কোন পদক্ষেপ নেয়নি। যা খুবই দু:খজনক। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য হয়ে দায়িত্বে যে অবহেলা, সাধারণ মানুষ হয়ে আমরা কেমনে নিরাপত্তা পাবো। এর সঙ্গে পুলিশের সংশ্লিষ্টতা আছে কী-না, বিষয়টি খতিয়ে দেখা উচিত।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে ছাত্রদল নেতা রিফাত হোসেনের সাথে মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
নওগাঁ জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মামুন বিন ইসলাম দোহা বলেন, ‘বিষয়টি শুনেছি। তবে বিস্তারিত জানা নেই। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ দিতে বলা হয়েছে। অভিযোগ পেলে দতন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কারো ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডের দায়ভার দল নিবে না ‘
আত্রাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুনসুর রহমান বলেন, ‘পুলিশ সেখানে ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ধরতে গিয়ে দেখে অনেক মানুষ। পরে পুলিশ এগিয়ে গেলে দেখে একজনকে আটক করে মারধর করা হচ্ছিল। স্থানীয়দের কথায় মারধরের শিকার ওই ছেলের যাতে কোন ক্ষতি না হয় সেই জন্য পুলিশ চেষ্টা করেছে। পুলিশের উপস্থিতিতে মারামারির ঘটনা সত্য নয় ‘ ওসি আরও বলেন, ‘এই ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালোনো হচ্ছে ‘
পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সাফিউল সারোয়ার বলেন, ‘বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সেখানে পুলিশের কোন গাফিলতি থাকলে অবশ্যই আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’
