ঈশ্বরদীর শেখ মেহের উল্লাহ্ স্মৃতি নিম্ন মাধ্যমিক ও চর সাহাপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠ দখল করে ফলসহ বিভিন্ন দোকান সমকাল

বিদ্যালয়ের জায়গা ও খেলার মাঠ দখল করে দোকান নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে এক জনপ্রতিনিধি ও বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে। এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ করেছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

পাশাপাশি দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। একটি শেখ মেহের উল্লাহ্ স্মৃতি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও অন্যটি চর সাহাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এ দুটি প্রতিষ্ঠানে পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী পড়ালেখা করে। তাদের জন্য খেলার মাঠ একটি। সেই মাঠ ও স্কুলের জায়গা দখল করে ৮-৯টি দোকান নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় ইউপি সদস্য সাহাপুর ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি সাজেদুল ইসলাম ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে। দোকানগুলো থেকে তিনি নিয়মিত চার হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা করে ভাড়াও নিচ্ছেন। দোকানের পাশে খালি জায়গাও ব্যবহার হচ্ছে মালপত্র রাখার কাজে।
দোকানি মীর হোসেন বলেন, ‘সাজেদুল মেম্বারের কাছ থেকে মাসিক পাঁচ হাজার টাকায় দোকান ভাড়া নিয়েছি। প্রতি মাসে তাঁর ছেলে সজীব ও সবুজ এসে টাকা নিয়ে যায়।’

তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ইউপি সদস্য ও বিএনপি নেতা সাজেদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমি কোনো জায়গা দখল করিনি। কেউ হয়তো আমার নাম করে সেখানে দোকান দিয়েছে। বিষয়টি আমার জানা নেই।’
জানা গেছে, স্কুল দুটি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের আবাসন গ্রিন সিটির সামনে। সেখানে খাবারের দোকান দেওয়ায় প্রতিদিন বিকেলে শত শত রাশিয়ান নাগরিকসহ স্থানীয় লোকজন মুখরোচক খাবারসহ ফাস্টফুড খেতে ভিড় করেন। এ কারণে এক বছর ধরে বিকেলে শিশু-কিশোরদের মাঠে খেলাধুলা ও সকালে শিক্ষার্থীদের প্রাত্যহিক সমাবেশ (শরীরচর্চা) বন্ধ রয়েছে। সন্ধ্যার পর স্কুলে মাদকের আড্ডা ও অসামাজিক কার্যকলাপ চলে বেশুমার। রাতে স্কুলের বারান্দায় মলমূত্র ত্যাগ করে পরিবেশ নোংরা করে রাখা হয়।

জায়গা দখল করে দোকানপাট নির্মাণে বাধা দিলে প্রধান শিক্ষককে লাঞ্ছিত করা হয়। হুমকি-ধমকি দেওয়া হয় শিক্ষকদের। বাধ্য হয়ে বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে মাঠ থেকে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ ও সন্ধ্যার পর মাদকসেবীর অসামাজিক কার্যক্রম বন্ধে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর লিখিত আবেদন করা হয়। ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি উপজেলা প্রশাসন।

সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল ফেরদৌস জাকিয়া জানায়, মাঠে দোকানের মালপত্র রাখা হয়েছে। লোকজনের ভিড় লেগেই থাকে। ভিড় ঠেলে ক্লাসে যেতে হয়। ক্রেতা-বিক্রেতারা অনেক সময় আজেবাজে মন্তব্য করে। শুনতে খারাপ লাগে।
একই অভিযোগ ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতী মেহনাজ, সপ্তম শ্রেণির ছাত্র রুমন হোসেন, অষ্টম শ্রেণির ছাত্র তানজিন শাফিনেরও। তাদের ভাষ্য, ‘এক বছর ধরে খেলাধুলা ও শরীরচর্চার ক্লাস বন্ধ রয়েছে। ক্লাসের ফাঁকে মাঠে যেতে ইচ্ছে করলেও উপায় নেই। আমরা আমাদের মাঠ ফিরে পেতে চাই।’
জ্যেষ্ঠ শিক্ষক মোহাম্মদ আলী জানান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য যে পরিবেশ দরকার তার ন্যূনতম অবস্থা নেই দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।

সহকারী শিক্ষক নাসির উদ্দিন বলেন, ‘ছুটির পর স্কুলের ভেতরে মাদক, জুয়া ও অসামাজিক কার্যকলাপ চলে। নৈশপ্রহরী মামুন হোসেন নিষেধ করলে তাঁকে হুমকি দেওয়া হয়। এমনকি প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়েছে।’
শেখ মেহের উল্লাহ্‌ স্মৃতি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আলী সাহান বলেন, ‘১৯৬৮ সাল থেকে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম চলছে। এতদিন কোনো সমস্যা হয়নি। ৫৭ বছর পর এমন পরিবেশ মানা যায় না। স্কুলমাঠে দোকান নির্মাণ করতে নিষেধ করায় আমাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছে। বাধ্য হয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর গত ২৮ এপ্রিল লিখিত আবেদন করেছি। আজও প্রতিকার মেলেনি।’ দখলদারদের বারবার বোঝানোর চেষ্টা করছেন শিক্ষকরা। তাদের সঙ্গে রুঢ় আচরণ করা হয়েছে। এ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি বরকত আলী মাঠ দখল করে ৮-১০টি দোকান স্থাপন হয়েছে স্বীকার করলেও, জড়িতদের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘সদ্য যোগদান করেছি। আপনার মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পারলাম। বিষয়টি তদন্ত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

Facebook
X
LinkedIn
Telegram
WhatsApp
Email