ভূঞাপুরে একজনের হাতে টাকা তুলে দেয়া ব্যক্তিটি ইউনিয়ন ছাত্রদলের সহসভাপতি শামীম

“টাঙ্গাইলে ভোটারদের মাঝে নগদ টাকা বিতরণের সময় জনতার তোপের মুখে জামায়াত নেতা” শিরোনামে একটি খবর প্রকাশিত হয়েছে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ডিবিসি এর ওয়েবসাইটে।

এই ঘটনার দৃশ্য দাবি করে টিভি চ্যানেলটি তাদের ফেসবুকে পেইজে একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে যেটির ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, “টাঙ্গাইলে ভোটারদের টাকা দেওয়ার অভিযোগ জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে”।

এই ভিডিওটি দেশ টিভি, সময় টিভিসহ আরও বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে কাছাকাছি শিরোনামে।

সময় টিভির এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কাজী নূরুল ইসলাম ভূঞাপুর ফাজিল মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক এবং উপজেলা জামায়াতের একজন সক্রিয় নেতা। টাকা বিতরণের সময় তার সঙ্গে উপজেলা জামায়াত ইসলামীর সাংগঠনিক সম্পাদক রবিউল আলমসহ আরও কয়েকজন নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।”

প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, ভোটারদের হাতে এক হাজার টাকার নোট তুলে দেয়া হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে জামায়াতের নেতাকর্মীরা ভোটারদের অর্থ দিয়ে ভোট কেনার চেষ্টা করছিলেন। এ সময় বিষয়টি টের পেয়ে ক্ষুব্ধ জনতা তাদের ঘিরে ধরে প্রতিবাদ জানায়।”

ভাইরাল হওয়া ১৯ সেকেন্ডের ভিডিওটিতে দেখা যায়, ৩ জন ব্যক্তি ক্যামেরার উদ্দেশ্যে হাত উচিয়ে এক হাজার ও পাঁচশো টাকার নোট দেখাচ্ছেন। এবং ভিডিওতে শোনা যাচ্ছে কেউ কেউ বলছেন, “টেহা দিছে, এই যে টেহা দিছে”।

তবে দ্য ডিসেন্ট-এর অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, এই ব্যক্তিরা বিএনপির রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট, যা সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রকাশ করা তথ্যের বিপরীত। স্থানীয় সাংবাদিক, পুলিশ, বিএনপি ও জামায়াতের নেতাদের সাথে কথা বলে এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

এদের মধ্যে ফুলহাতা সাদা শার্ট পরিহিত যে ব্যক্তি এক হাজার টাকার নোট দেখাচ্ছেন তার নাম বৈ খাঁ। তার বাবার নাম মেগবর খাঁ। তিনি স্থানীয় বিএনপি কর্মী।

হলুদ শার্ট ও কালো জ্যাকেট পরিহিত যে ব্যক্তি একহাতে মোবাইলে কথা বলতে বলতে অন্য হাতে পাঁচশো টাকার নোট প্রদর্শন করছেন তার নাম ইসমাইল। তিনি বিএনপি সমর্থক হিসেবে স্থানীয়ভাবে পরিচিত।

এরপর দেখা যায় হলুদ গেঞ্জি ও লুঙ্গি পরা এক যুবক হাতে টাকা পাঁচশো টাকার নোট নিয়ে এসে বৃদ্ধ এক ব্যক্তির হাতে গুঁজে দিচ্ছেন। লুঙ্গি পরা এই যুবকের নাম শামীম। ঘটনাস্থলে হাজির থাকা অর্জুনা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি নিয়ামত খাঁ দ্য ডিসেন্টকে জানিয়েছেন শামীম হলেন একই ইউনিয়ন ছাত্রদলের সহসভাপতি।

আর যার হাতে পাঁশো টাকার দুটি নোট গুঁজে দিয়েছেন শামীম তার নাম নুরুল ইসলাম। তিনি স্থানীয় ব্যক্তি যার কোন রাজনৈতিক দলের সাথে সংশ্লিষ্টতা নেই বলে জানিয়েছে স্থানীয় একাধিক সূত্র।

১৯ সেকেন্ডের ভিডিও আরও দেখা যাচ্ছে লাবু খাঁকে (ক্যাপ পরা লাল দাড়িওয়ালা ব্যক্তি), যিনি ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের আহবায়ক। তাকে অন্য নেতাকর্মীদের সাথে ভিডিওতে দেখা গেলেও কারো হাতে টাকা তুলে দিতে দেখা যায়নি।

ভিডিওটির একদম শুরুতে মোবাইলে কথা বলতে বলতে (পাঞ্জাবি পরিহিত লাল দাড়িওয়ালা ব্যক্তি) সামনে এগিয়ে যেতে দেখা যায় জামায়াতের ইউনিয়ন সভাপতি কাজী নুরুল ইসলামকে।

কী ঘটেছিল সেখানে?
ঘটনাস্থলের সাড়ে ৪ মিনিটের আরেকটি ভিডিও সংগ্রহ করেছে দ্য ডিসেন্ট। ভিডিওটিতে দেখা যাচ্ছে, একটি বাড়ির উঠানে লোকজনের জটলা। তাতে দুই পক্ষে বাদানুবাদের বিষয়টি স্পষ্ট।

ভিডিওতে জামায়াতের একজনকে বলতে শোনা যায়, “আপনার এরকম করলেন কেন? আপনাদের কাজে কি আমরা বাধা দিছি? আপনারা আমাদের এলাকায় গিয়া মিছিল মিটিং করেন না?”

জবাবে বিএনপি পক্ষের বয়স্ক একজনকে বলতে শোনা যায়, “ভোট চাইবেন, মিটিং করবেন কিয়েরে (কেন)? সভাপতির বাড়িতে এসে আপনারা.. এখানে সভাপতির বাড়ি আছে।”

তখন জামায়াতের ওই ব্যক্তিকে আবার বলতে শোনা যায়, “আমাদের ইউনিয়ন সভাপতির বাড়ির কাছে মিটিং করেন না আপনারা? আমরা কি আপনাদের কোথাও বাধা দিছি কখনো? চেয়ার দিয়া বাড়ি দিলো, উনাকে কেন চেয়ার দিয়া বাড়ি দিল?”

স্থানীয় একাধিক সাংবাদিকের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বুধবার সকাল ১০টার দিকে অর্জুনা ইউনিয়নের জগতপুরা গ্রামের মধ্যপাড়ায় ভোটের গণসংযোগে যান জামায়াত নেতাকর্মীরা। তাদের নেতৃত্বে ছিলেন ইউনিয়ন জামায়াতের সভাপতি কাজী নুরুল ইসলাম এবং উপজেলা সাংগঠনিক সম্পাদক রবিউল ইসলাম। ওই গ্রামটির বাসিন্দা হলেন ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি নিয়ামত আলী খাঁ। গণসংযোগের এক পর্যায়ে স্থানীয় বিএনপির কিছু নেতাকর্মী ঘটনাস্থলে হাজির হয়ে সেখানে মিটিং করতে বাঁধা দেন। সাড়ে ৪ মিনিটের ভিডিওটি ওইসময় রেকর্ড করা।

জামায়াতের উপজেলা আমির আব্দুল্লাহ আল মামুন দাবি করেছেন, তাদের গণসংযোগে বাঁধা দেয়ার সময় তাদের ওপর হামলা করেছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা।

যদিও বিএনপির জগৎপুরা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি নিয়ামত আলী খা মাস্টার তা অস্বীকার করেছেন।

তিনি বলেন, “আমি পাবলিকের হই-হল্লা শুনে ওখানে গেছি। জামায়াতের লোকেরা আওয়ামী লীগের লোক নিয়ে ভোট চাইতে আসছে এজন্য পাবলিক তাদেরকে বাধা দিছে। পাবলিক বলছে তারা নাকি মানুষকে টাকা দিতেছিল। আমি গিয়া বলছি আপনারা ভোট চান কিন্তু নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের লোক নিয়ে আসছেন কেন।”

জামায়াতের লোকদের টাকা দিতে দেখেছেন কিনা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, “আমি দেখি নাই তবে পাবলিক বলছে তারা নাকি টাকা দিছে।”

হামলার ঘটনা ঘটেছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এটা মিথ্যা অভিযোগ। অভিযোগ করলেই তো হইলো না। তর্ক-বিতর্ক হইসে। কারো গায়ে হাত দেয়নি।”

ভূঞাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাব্বির রহমান বলেন, “জামায়াতের ৪ জন লোক সেখানে নির্বাচনী প্রচারণা করতে গেলে স্থানীয় বিএনপির লোকজন তাদের হ্যান্ডমাইক ছিঁড়ে ফেলেছে আর একজনের ফোন কেড়ে নিয়ে গেছে। পরে ফোন ফিরিয়ে দিয়েছে। এখানে জামায়াতের লোকজন টাকা-পয়সা বিলায়নি। বিএনপি সমর্থকরা টাকা বের করে ভিডিও করেছে।”

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: মাহবুব হাসান বলেন, “ঘটনার কথা শুনে সেখানে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ফোর্স গিয়েছে। জুডিশিয়ারি ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। তদন্তে যা পাওয়া যায় সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।”

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ রাজিব হোসেন বলেন, “আমরা সরেজমিনে গিয়ে সেখানে যা বুঝলাম তাদের মাঝে ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া একেক পক্ষ একেকরকম দাবি করছে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের চোখের সামনে কোন ঘটনা না ঘটলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সিদ্ধান্ত দিতে পারেন না।”

Facebook
X
LinkedIn
Telegram
WhatsApp
Email