নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলার দাউদপুর ইউনিয়নের নোয়াগাঁও গ্রাম। এ গ্রামে রয়েছে শারীরিক প্রতিবন্ধী মনোয়ার হোসেন ওরফে অপুর (৪৩) জিআই তার উৎপাদনের একটি কারখানা। কারখানা কর্তৃপক্ষ বলছে, সুইজারল্যান্ড, জার্মানিসহ ১২টি দেশে রপ্তানি হয় এ জিআই তার।
কারখানার নাম বিএলও ওয়্যার নেইল ইন্ডাস্ট্রিজ। গত রোববার সকালে গিয়ে দেখা যায়, কারখানার বাইরে ভাঙচুরের চিহ্ন। সামনে পুলিশের পাহারা। সাংবাদিক পরিচয় দিলে কারখানার ব্যবস্থাপক অলিউল্লাহ এগিয়ে এসে কথা বলেন। তিনি বলেন, ১৭ ফেব্রুয়ারি কারখানাটিতে কর্মীদের মারধর, ভাঙচুর এবং ট্রাক এনে মালামাল লুট করা হয়েছে। হামলার পর দুই দিন উৎপাদন বন্ধ ছিল। পরে শিল্প পুলিশের পাহারায় সীমিত পরিসরে উৎপাদন শুরু হয়।
ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় বিএনপির কিছু নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে। কারখানা কর্তৃপক্ষ বলছে, বিএনপির রূপগঞ্জ উপজেলার সভাপতি মাহফুজুর রহমান হুমায়ুনের পরিচয় ব্যবহার করে স্থানীয় বিএনপির একদল লোক বিএলও ওয়্যার নেইল ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক মনোয়ার হোসেনের কাছে এককালীন ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। পাশাপাশি মাসে ১ লাখ টাকা করে দেওয়ার দাবিও আছে তাঁদের। চাঁদা না দেওয়ায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটানো হয়।
মনোয়ার হোসেন গত শুক্রবার প্রথম আলোকে বলেন, ১৭ ফেব্রুয়ারি বেলা ১১টার দিকে লুটপাট শুরু হয় কারখানাটিতে, যা চলে দেড় ঘণ্টা ধরে। রূপগঞ্জ থানা থেকে কারখানাটিতে যেতে ১৫-২০ মিনিট লাগে। কিন্তু তিনি জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন দিলে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে দুই ঘণ্টা পর। ততক্ষণে হামলাকারীরা চলে যায়।
‘পুলিশ আসে দুই ঘণ্টা পর’
নোয়াগাঁও ও এর পার্শ্ববর্তী দাউদপুর এলাকাটি ঘনবসতিপূর্ণ। এ এলাকায় বেশ কিছু হালকা প্রকৌশল, রাসায়নিক এবং বস্ত্রশিল্প কারখানা রয়েছে। কিছু মাঝারি ও ক্ষুদ্র উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠেছে। তার একটি বিএলও ওয়্যার নেইল ইন্ডাস্ট্রিজ। ২০২০ সালে সাড়ে ১০ শতাংশ জমি কিনে এ কারখানা গড়ে তোলেন মনোয়ার হোসেন। কারখানাটিতে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের অর্থায়ন রয়েছে।
মনোয়ার হোসেন গত শুক্রবার প্রথম আলোকে বলেন, ১৭ ফেব্রুয়ারি বেলা ১১টার দিকে লুটপাট শুরু হয় কারখানাটিতে, যা চলে দেড় ঘণ্টা ধরে। রূপগঞ্জ থানা থেকে কারখানাটিতে যেতে ১৫-২০ মিনিট লাগে। কিন্তু তিনি জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন দিলে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে দুই ঘণ্টা পর। ততক্ষণে হামলাকারীরা চলে যায়।
কারখানার তিনজন শ্রমিক ও স্থানীয় একজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, হামলাকারীরা কারখানার প্রধান ফটক ও সীমানাপ্রাচীর শাবল দিয়ে ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। এ সময় কারখানার ব্যবস্থাপক অলিউল্লাহ খান বাধা দিতে গিয়েছিলেন। তাঁকে মারধর করা হয়। ব্যবস্থাপককে রক্ষা করতে এগিয়ে এলে কর্মচারী জুলহাস উদ্দিনকেও পিটিয়ে আহত করা হয়। পরে তাঁদের রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।
হামলাকারীরা কারখানার সিসিটিভি (ক্লোজড সার্কিট) ক্যামেরাও ভেঙে ফেলে, আসবাব ভাঙচুর করে এবং ট্রাক এনে মূল্যবান যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল লুট করে নিয়ে যায় বলে দাবি করেছে কর্তৃপক্ষ।
মামলায় উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি বেলায়েত আকনকে প্রধান আসামি করা হয়। এজাহারে বলা হয়, হামলাকারীরা নগদ অর্থসহ ১ কোটি ৬৬ লাখ টাকার পণ্য নিয়ে গেছে।
মামলার আসামি যাঁরা
কারখানার মালিক মনোয়ার বলেন, তিনি ঘটনার দিন মামলা করতে যান। তখন রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সবজেল হোসেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাহফুজুর রহমানের নাম বাদ না দিলে মামলা নিতে অপারগতা জানান। পরদিন ১৮ ফেব্রুয়ারি তিনি (মনোয়ার) বাদী হয়ে মাহফুজুর রহমানের নাম বাদ দিয়ে মামলা করেন। মামলায় ৯ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ১৫-২০ জনকে আসামি করা হয়।
মামলায় উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি বেলায়েত আকনকে প্রধান আসামি করা হয়। অন্য আসামিদের মধ্যে উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাহফুজুর রহমানের ছোট ভাই কাজল আকন, ভাইয়ের ছেলে নিশাত আকন, মাহফুজুর রহমানের অনুসারী হিসেবে পরিচিত বিএনপির কর্মী মো. সজল হোসেন, সাদিকুল, মো. ফাহিম, আজিজ মৌলভি ও বোরহানউদ্দিনের নাম রয়েছে। আসামিদের বেশির ভাগই জিন্দা গ্রামের বাসিন্দা।
এজাহারে বলা হয়, হামলাকারীরা নগদ অর্থসহ ১ কোটি ৬৬ লাখ টাকার পণ্য নিয়ে গেছে। বাদী মনোয়ার হোসেন বলেন, উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি বেলায়েত আকন ও নিশাত আকন সভাপতি মাহফুজুর রহমানের নাম ব্যবহার করে দফায় দফায় চাঁদা দাবি করেছেন। অন্তত চার দফায় বিষয়টি মাহফুজুর রহমানকে জানিয়েছেন তিনি। কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো চাঁদা দাবি করা লোকদের সঙ্গে মীমাংসার প্রস্তাব দিয়ে আসছিলেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি।
মনোয়ার হোসেনের দাবি, মঙ্গলবার মাহফুজুর রহমান ঘটনার সময় হাজির না হলেও তাঁর নির্দেশেই কারখানায় হামলা ও লুটপাট হয়েছে। মামলা করার সময় হুকুমের আসামি হিসেবে এজাহারে তিনি মাহফুজুর রহমানের নাম উল্লেখ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু থানার ওসি মাহফুজুরের নাম বাদ না দিলে মামলা নেবেন না বলে জানান। তিনি বাধ্য হয়ে মাহফুজুরের নাম বাদ দিয়ে মামলা করেছেন।
রূপগঞ্জ থানার ওসি মো. সবজেল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, তিনি কারও নাম বাদ দিতে বলেননি। তিনি বলেছেন মামলায় সত্য ঘটনা দিতে।
