ইহিতা ইশরার ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। রাজনীতি সচেতন এই তরুণী নিয়মিত ফেসবুকে লেখালেখি করেন দেশের রাজনীতি ও সমাজ নিয়ে। ঢাকার সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক মহলেও অল্পবিস্তর পরিচিতি আছে তার। ইহিতার পোস্ট পড়ে ‘লাইক’ ‘কমেন্ট’ করেন তাদের কেউ কেউ। সুন্দরী এই তরুণীর প্রোফাইল ছবিতেও ‘লাভ’ বা ‘কেয়ার’ রিয়েক্ট দিয়ে পাশে থাকার চেষ্টা করেন অনেকে। ঢাকার তরুণ রাজনীতিক, সিনিয়র সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীদের অনেককেই দেখা গেছে ইহিতা ইশরারের ফেসবুক ফ্রেন্ডলিস্টে।
গত ১০ ফেব্রুয়ারি ইহিতা পোস্ট করেন, “আলহামদুলিল্লাহ! ৫০ এর প্রিলিমিনারি টিকছি”। পোস্টে শতাধিক রিয়েক্ট পড়লেও কমেন্ট করার অপশনটি বন্ধ রেখেছিলেন তিনি।
একইদিন রিয়ানা রুশা নামে এক তরুণী তার ভেরিফায়েড প্রোফাইল থেকে ইহিতা ইশরারের প্রোফাইলের স্ক্রিনশট পোস্ট করে তার বন্ধু ও অনুসারীদের প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে জানান যে, এই প্রোফাইলটি তার ছবি ব্যবহার করলেও এটি তার নিজের ‘নতুন প্রোফাইল’ নয়। নিজের বন্ধুদের যারা এই ভুয়া আইডিকে তার আইডি ভেবে সেটির বন্ধু তালিকায় যুক্ত হয়েছেন তাদেরকে কিছুটা তিরস্কারও করেছেন রিয়ানা।
ইহিতা ইশরারের প্রোফাইল ছবি, কভার ছবি এবং অন্যান্য যেসব ছবি তার নিজের বলে পোস্ট করেন সেসব বিশ্লেষণ করে দ্য ডিসেন্ট নিশ্চিত হয়েছে সবগুলো ছবিই রিয়ানা রুশার ফেসবুক এবং ইনস্টাগ্রাম একাউন্ট থেকে নেয়া।
‘মাদারীপুর ও ফরিদপুরের’ সুন্দরীদের নেটওয়ার্ক!
আর্মি মেডিকেল কলেজের সুন্দরী লেকচারার পৌষালী আহমেদ অথৈ গত ১৩ ফেব্রুয়ারি তার প্রোফাইল থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একটি ছবি পোস্ট করে ক্যাপশনে লিখেছেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে, মহামান্য রাষ্টপতির পক্ষে থেকে বিজয়ের শুভেচ্ছা।”
একইদিনে আইডিটি থেকে তিনবার বিএনপির পক্ষে পোস্ট দেয়া হয়েছে।
আবার সুদূর টোকিও থেকে নির্বাচনের ঠিক আগে আরেক ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী’ যার দেশের ঠিকানাও আবার মাদারীপুর, জামায়াত–এনসিপি জোটের ছবি দিয়ে লিখছে, “ফেসবুকে গঠিত সরকারের মন্ত্রী পরিষদ?”।
এরা স্বাধীন মতামতদাতা? না। যাচাইয়ে নেওয়ায় দেখা যায়, তাদের ছবিগুলো আসলে ভিন্ন ভিন্ন ইনস্টাগ্রাম মডেলদের, পরিচয় ভুয়া, এবং পোস্টগুলো কাছাকাছি সময়ে একই ধরণের রাজনৈতিক মতের উপর ভিত্তি করে ছড়ানো।
আসলে এটি একটা সমন্বিত ভুয়া আইডি নেটওয়ার্ক; যাদের বিএনপির পক্ষে প্রচারণা চালাতে দেখা যাচ্ছে। অনুসন্ধানে এমন ১২টিরও বেশি প্রোফাইলের নেটওয়ার্কে উঠে এসেছে: ঠিকানার মিল, চুরি ছবি, একে অন্যের পোষ্ট শেয়ারিং। এদের সাথে আবার বন্ধু হিসেবে যুক্ত হচ্ছেন দেশের প্রথিতযশা সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, আইনজীবী বা অনলাইন এক্টিভিষ্ট, সাহিত্যিক-লেখকরা।
যেমন, Poushalee Ahmed Athoy নামের একটি আইডি, খোলা হয়েছে ৫ আগস্টের ঠিক পরে। আইডিটি প্রায়ই বিএনপির পক্ষে এবং জামায়াত এনসিপির পক্ষে লিখেন। যেমন, ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ছবি পোস্ট করে লিখেছেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে, মহামান্য রাষ্টপতির পক্ষে থেকে বিজয়ের শুভেচ্ছা।”। ১৩ ফেব্রুয়ারি এক দিনে প্রায় তিনের অধিক স্ট্যাটাস দিয়েছেন বিএনপির পক্ষে, পরামর্শ বা রাজনৈতিক বিশ্লেষণ পোস্ট করে। আবার ১১ ফেব্রুয়ারি জামায়াতের নেতৃত্বধীন ১১ দলীয় জোটের ছবি পোস্ট করে লিখেহচনে, “ফেইসবুকে গঠিত সরকারের মন্ত্রী পরিষদ শপথ অনুষ্ঠান নাকি?”
আইডিটির সর্বশেষ ১০টি রাজনৈতিক পোস্ট বিশ্লেষণে দেখা যায়, তিনি জামায়াত-এনসিপি জোটের বিপক্ষে পোস্ট দিয়েছেন ৭টি, বিএনপির পক্ষে দিয়েছেন ৩টি।
ফেসবুকের দেয়া তথ্য অনুযায়ী Poushalee Ahmed Athoy আইডির ব্যক্তিটি আর্মি মেডিকেল কলেজ, যশোরে লেকচারার হিসেবে কর্মরত এবং ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কাজ করছেন। স্থানীয় ঠিকানা হিসেবে বলা আছে, বৃহত্তর ফরিদপুরের মাদারীপুর জেলায়। কিন্তু আর্মি মেডিকেল কলেজ যশোরের ওয়েবসাইটে খুঁজে এমন কোনো নাম খুঁজে পায়নি দ্য ডিসেন্ট। ওয়েবসাইটে সেই কলেজের লেকচারার থেকে অধ্যাপক সবার ছবিসহ তালিকা রয়েছে। আরও সার্চ করে দেখা যায়, Poushalee Ahmed Athoy এর প্রফাইল পিকচারটিও অন্য জায়গা থেকে নেয়া। মূলত রিয়া দেব রয় নামে পশ্চিম বাংলার একজন ইন্সটাগ্রাম মডেলের ছবিটি নিজের প্রোফাইল পিকচার হিসেবে ব্যবহার করছেন।
প্রায় দু মাস আগে গত ৩১ জানুয়ারি Poushalee Ahmed Athoy থেকে Nawreen Jahan Hafsa নামের আরেকটি ফেসবুক আইডির একটি পোস্ট শেয়ার করা হয়। পোস্টটির শিরোনাম ছিল, “কর্মজীবি লাখো নারীকে পতিতার সাথে তুলনা করলেন জামাত আমির।” তার আগে Nawreen Jahan Hafsa আইডি থেকে ১১ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে সৈয়দপুর বিমানবন্দরে জামায়াত নেতার ৭৪ লাখ টাকা নিয়ে ধরা পরার ঘটনাটি শেয়ার করেছেন। আরেকটি পোস্টে বিএনপির পক্ষে ভোটকেন্দ্র পাহারা দেয়ারও আহবান জানান।
Nawreen Jahan Hafsa এর সর্বশেষ ১০টি রাজনীতি সংক্রান্ত পোস্ট বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তিনি বিএনপির পক্ষে দিয়েছেন ৩টি পোস্ট, জামায়াত-এনসিপই জোটের বিরুদ্ধে দিয়েছেন ৫টি পোস্ট।
Nawreen Jahan Hafsa এর ফেসবুক আইডিমতে তিনি বর্তমানে জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন এবং তার বাড়িও বৃহত্তর ফরিদপুরের মাদারীপুর জেলায়। তিনি প্রায়শই রাজনৈতিক পোস্টের পাশাপাশি নিজের ব্যক্তিগত ছবিও পোস্ট করে থাকেন যেগুলোতে অনেক প্রভাবশালী আইনজীবী, রাজনৈতিক এক্টিভিস্ট, রাজনীতিবিদকে লাইক দিতে দেখা যায়।
তার পরিচয় নিশ্চিত হতে Nawreen Jahan Hafsa নাম দিয়ে টোকিও বিশ্ববিদ্যালয় সার্চ করে তেমন কিছু পাওয়া যায়না। পরবর্তীতে আইডিটির প্রফাইল পিকচার যাচাইয়ে দেখা যায়, এটি মূলত রুকাইয়া আফরোজ নামে একজন ইন্সটাগ্রাম মডেলের ছবি যার লিংকডিন আইডিতে দেখা যাচ্ছে তিনি জাপানের টকিও ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে অধ্যয়নরত আছেন।
উপরে উল্লেখিত Nawreen Jahan Hafsa এবং Poushalee Ahmed Athoy নামের দুইটি আইডিতে যা শেয়ার করা হয় তার বেশ কিছুতে মিল রয়েছে। দুটি আইডিতেই বিএনপির পক্ষে এবং জামায়াত এনসিপি সমর্থিত জোটের বিরুদ্ধে পোস্ট করা হয়। দুটি আইডিরই স্থানীয় ঠিকানা মাদারীপুরে দেয়া। দুটি আইডিরই প্রোফাইল পিকচার দুজন আলাদা ইন্সটাগ্রাম মডেলের প্রোফাইল থেকে নেয়া।
