কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলায় কোমলপানির বোতলের ছিপি ছোড়াকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অনুসারীদের মধ্যে গোলাগুলি এবং বাড়িঘরে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় গুলিবিদ্ধসহ অন্তত সাত জন আহত হয়েছেন। রবিবার বিকাল ৫টা থেকে রাত দেড়টা পর্যন্ত উপজেলার কয়া ইউনিয়নের বেড় কালোয়া জামে মসজিদ এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এরই মধ্যে গুলি ছোড়ার একাধিক ভিডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছড়িয়ে পড়েছে।
আহতরা হলেন- রাধাগ্রামের মো. রাব্বি (২২), আজম শেখ (৫৪), মো. ওবাইদুল্লাহ (৩০), জনি শেখ (২০), বেড় কালোয়া গ্রামের শারুফ শেখ (২০), জাহাঙ্গীর আলম (৪৫) ও মো. শফিউদ্দিন (৬৫)। তাদের মধ্যে রাব্বি, জনি, আজম ও শারুফ গুলিবিদ্ধ হওয়ায় কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। অন্যরা প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন। আহতদের সবাই ওই ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি রাশিদুল ইসলামের সমর্থক। হামলার পর গতকাল রাত দেড়টার দিকে রতন শেখ (৫০) নামে একজনের বাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এতে তার বসতঘর ও আসবাব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। রতন ওই এলাকার রেজন শেখের ছেলে ও জেলেপাড়ার সরদার আওয়ামী লীগ কর্মী ইয়ারুল শেখের সমর্থক।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পদ্মা নদীতে মাছ ধরা ও অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, চাঁদা তোলা ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি রাশিদুল ইসলামদের সঙ্গে বেড় কালোয়া জেলেপাড়ার সরদার আওয়ামী লীগ কর্মী ইয়ারুল শেখ পক্ষের দীর্ঘদিনের বিরোধ চলছে। রবিবার সকালে ইয়ারুলের সমর্থক রতন শেখ কোমল পানীয় পান করার পর বোতলের ছিপি ছোড়েন। ছিপিটি গিয়ে গ্রামের ‘ক্যাসেট’ নামের এক ব্যক্তির মাথায় লাগে। এ সময় ক্যাসেট বকাবকি করলে রতন তাকে মারধর করেন। বিষয়টি ক্যাসেট বাড়ি গিয়ে তার ছেলে মামুনকে জানান। মামুন গিয়ে তার বাবাকে মারধরের কারণ জানতে চাইলে রতন তাকেও মারধর করেন। সে সময় বিএনপি নেতা রাশিদুলের সমর্থক আলম শেখ এসে রতনকে একটা চড় মারলে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
স্থানীয় লোকজন বিষয়টি মিটমাট করে সবাইকে নিজ নিজ বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। এরপর বিকালে রতন, ইয়ারুল শেখ, নাসের উদ্দিনসহ তাদের লোকজন গিয়ে বেড় কালোয়া জামে মসজিদ এলাকায় দেশীয় ও আগ্নেয়াস্ত্রসহ অতর্কিত হামলা চালায়। এতে বিএনপি নেতা রাশিদুলের অন্তত সাত জন অনুসারী গুলিবিদ্ধ হন। রাত দেড়টার দিকে হঠাৎ ইয়ারুলের সমর্থক রতন শেখের বাড়িতে আগুন দেখতে পান স্থানীয় লোকজন। পরে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস আগুন নিয়ন্ত্রণ করলেও পুড়ে গেছে রতনের বসতঘর ও আসবাব। তবে আগুনের সূত্রপাত জানা যায়নি। সে সময় ওই বাড়িতে কেউ ছিল না।
হামলার কয়েকটি ভিডিও ক্লিপ রবিবার রাতেই ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়। ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, কৃষিজমিতে অর্ধশতাধিক মানুষ ছোটাছুটি করছেন। তাদের অনেকের মাথায় হেলমেট। অনেকের হাতে ঢাল, সরকি, লাঠিসোঁটা, আগ্নেয়াস্ত্র।
আহত জনি, রাব্বি ও শারুফকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। তাদের হাতে, বুকে, পায়ে ছড়রা গুলি লেগেছে। আহত মো. রাব্বি বলেন, ‘রবিবার সকালে বোতলের ছিপি ছোড়া নিয়ে প্রতিপক্ষের রতনের সঙ্গে হাতাহাতি হয়েছিল। বিকালে রতন সন্ত্রাসী ইয়ারুলসহ তার বাহিনী দিয়ে গুলি করেছে। আমার বুক, হাত, পা-সহ সবখানে অসংখ্য গুলি লেগেছে।’
জনি শেখ বলেন, ‘আমরা ১০-১২ জন মসজিদের পাশের মাঠে আড্ডা দিচ্ছিলাম। তখন জেলেপাড়ার সরদার সন্ত্রাসী ইয়ারুল শেখ, নাসের উদ্দিন, সোহেলসহ কয়েক শ সন্ত্রাসী দেশীয় অস্ত্র ও পিস্তল, শটগান নিয়ে অতর্কিত হামলা চালায়।’
কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা হোসেন ইমাম জানান, গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে চার জন ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে রাব্বি নামের একজনের বুকে গুলি লাগায় তাকে ঢাকায় রেফার্ড করা হয়েছে।
বিএনপি নেতা রাশিদুলের পক্ষের আলম শেখ জানান, সামান্য ঘটনা নিয়ে রতন অন্য গ্রামের সন্ত্রাসীদের এনে হামলা চালিয়েছে। এতে গুলিবিদ্ধ রাব্বির অবস্থা আশঙ্কাজন শুনে নিজেরা ঘরে আগুন লাগিয়ে পালিয়েছে।
রাশিদুল ইসলাম বলেন, ‘আওয়ামী লীগ কর্মী ও পদ্মায় নদীতে পুলিশ হত্যা মামলার প্রধান আসামি ইয়ারুল, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীরের ভাই সোহেল রানা, সন্ত্রাসী নাসের উদ্দিনরা আমার লোকদের ওপর অতর্কিত হামলা করেছেন। এতে সাত জন গুলিবিদ্ধ হন। মামলার প্রস্তুতি চলছে।’
কুমারখালী থানার ওসি জামাল উদ্দিন বলেন, ‘পূর্বশত্রুতার জেরে হামলা ও গুলির ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। এতে বেশ কয়েকজন আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এ ব্যাপারে লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
