বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জের জাঙ্গালিয়া ইউনিয়নের চর ভোলানাথে গত ১৭ জুলাই বিএনপির দুপক্ষের সংঘর্ষের সময় অর্ধশতাধিক ঘর ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়। ছবি: সমকাল
বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জের জাঙ্গালিয়া ইউনিয়নে চর ভোলানাথ আদর্শ গ্রামের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ১০ দিন ধরে উত্তেজনা চলছে। দুপক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলা ও মামলায় এখানে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আশপাশের লোকজনও আতঙ্কে ওই গ্রামে যাচ্ছেন না। দুপক্ষই বিএনপির রাজনীতিতে জড়িত। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আদর্শ গ্রামে পালা করে পাঁচ পুলিশ সদস্য পাহারা দিচ্ছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, আদর্শ গ্রামের আধিপত্য নিয়ে ঘটনার শুরু। বিষয়টি এখন আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকেন্দ্রিক বিরোধে গড়িয়েছে। দুজন চেয়ারম্যান প্রার্থী ও দুজন মেম্বার প্রার্থীর পক্ষে-বিপক্ষে ভাগ হয়ে গেছেন গ্রামের বাসিন্দারা। পরিস্থিতি সামাল দিতে মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা বিএনপি ওই ৯ নম্বর ওয়ার্ড কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেছে।
সরেজমিন জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কালাবদরের নদীর তীরে চর ভোলানাথে নির্মিত দুটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের নাম দেওয়া হয়েছে আদর্শ গ্রাম। দুটি আশ্রয়ণে দুই শতাধিক পরিবারের বাস। এর আশপাশে আরও বসতি গড়ে উঠেছে। পেশায় অধিকাংশই জেলে। ১৭ জুলাই বিকেল থেকে দুপক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলায় এক আইনজীবীসহ চারজন গুরুতর জখম হন। এ সময় লুট হয় অর্ধশতাধিক বসতঘর।
স্থানীয়দের ভাষ্য, চারদিকে কালাবদরের মাঝে একটি দ্বীপ ইউনিয়নটি বরিশাল সদরের চরমোনাই ইউনিয়ন-সংলগ্ন। মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে স্পিডবোটে জাঙ্গালিয়া পৌঁছাতে আধা ঘণ্টার বেশি সময় লাগে। দুর্গম এলাকা হওয়ায় ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় প্রভাবশালীরাই এখানকার নিয়ন্ত্রক। ৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের পর আশ্রয়ণ প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ পেতে বিএনপির দুপক্ষ বিরোধে জড়ায়।
গ্রামের বাসিন্দা আইনউদ্দিন ফকির ও নুর উদ্দিন জানান, চর ভোলানাথে দুই গ্রুপের একটির নেতৃত্ব দেন ওয়ার্ড ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. রিপন ও অন্যটির ৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলী বয়াতি। দুজনই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ৯ নম্বর ওয়ার্ডে মেম্বার প্রার্থী হতে চান। আলী বয়াতি আবার সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী ইউনিয়ন বিএনপি সভাপতি শাহাবুদ্দিন আজাদের সমর্থক। আলী বয়াতির প্রতিপক্ষ অ্যাডভোকেট রিপন সমর্থন করেন আরেক সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি মোন্তাজিক মামুন সোহাগকে। সহিংসতার জন্য একপক্ষ অন্যপক্ষকে দায়ী করছে।
গ্রামবাসী আইনউদ্দিন ফকিরের দাবি, তারা রিপনকে মেম্বার প্রার্থী করতে চান। তাঁর প্রার্থিতা ঠেকাতে আলী বয়াতি পরিকল্পিতভাবে ১৭ জুলাই বিকেলে রিপনকে ডেকে নিয়ে নির্মম নির্যাতন করেছে। তাঁকে উদ্ধার করতে গেলে রিপনের ভাই আরিফকে আটকে নির্যাতন করা হয়। রিপনের শরীরের বিভিন্ন স্থানে পেরেক ঠুকে দেওয়া হয়। দুই ভাই এখন ঢাকায় চিকিৎসাধীন। একই সময়ে আলী বয়াতির ছেলের গলায় কোপ দেওয়া হয়। তাঁর অনুসারী সালাম বয়াতিকেও নির্যাতন করা হয়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তারাও ঢাকায় চিকিৎসাধীন।
গ্রামবাসীর সঙ্গে কথা বলে গেছে, ওই দিন বিকেল থেকে পরের দুদিন দুটি গুচ্ছগ্রামে অর্ধশতাধিক বসতঘর ও দোকানপাট ভাঙচুর করে লুটতরাজ চালানো হয়। সরেজমিন দেখা যায়, ঘরগুলো এখনও বিধ্বস্ত পড়ে আছে। বাসিন্দারা গ্রাম ছেড়ে আত্মগোপনে। গণি আমিন নামে একজনকে দেখা গেছে শতাধিক নারীকে সংগঠিত করে প্রতিপক্ষকে মোকাবিলায় উস্কানিমূলক কথা বলছেন। তিনি রিপনের অনুসারী বলে দাবি করেছেন।
একাধিক গ্রামবাসী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গত ২ এপ্রিল আদালতে হাজিরা দিতে যাওয়ার পথে আব্বাস ও রিয়াজ নামে দুই ভাইকে অ্যাডভোকেট রিপনের অনুসারীরা নির্যাতন করে। ঢাকায় উন্নত চিকিৎসা শেষে তারা সম্প্রতি গ্রামে ফিরেছেন। এর জেরেই ১৭ জুলাই রিপনের ওপর হামলা হয়। এর পর দুটি আদর্শ গ্রামে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে।
এ ব্যাপারে ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি মোন্তাজিক মামুন সোহাগ বলেন, চর ভোলানাথের দাঙ্গা-হাঙ্গামার বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। আমি চেয়ারম্যান প্রার্থী হবো এমন কথা কাউকে বলিনি।
ইউনিয়ন বিএনপি সভাপতি সাহাবুদ্দিন আজাদ বলেন, দুটি আদর্শ গ্রামে প্রভাব বিস্তার নিয়ে স্থানীয় কয়েকজনের বিরোধ থেকে ঘটনার শুরু। এখন সেখানে বিএনপির রাজনীতি ও ইউনিয়ন নির্বাচন প্রসঙ্গ টেনে ঘটনাটি ভিন্ন খাতে নেওয়ার চক্রান্ত হচ্ছে।
উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব শিহাব আহমেদ সেলিম বলেন, যতটুকু জেনেছি, প্রভাব বিস্তার নিয়েই এসব ঘটনা হচ্ছে। এর সঙ্গে দলের কেউ না কেউ জড়িত থাকতে পারে। তাই ৯ নম্বর ওয়ার্ড কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে।
মেহেন্দীগঞ্জ থানার ওসি মো. মোমিন উদ্দিন জানান, দুপক্ষ থেকে দুটি মামলা হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে একজনকে। দুপক্ষের আসামিরাই এলাকা ছেড়ে আত্মগোপন করেছে।
