চট্টগ্রামে গত এক-দেড় বছরে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নাম জড়িয়ে একের পর এক সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ, খুন, অস্ত্র উদ্ধার, চাঁদাবাজি ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। প্রতিটি ঘটনার পরই স্থানীয় নেতারা একে অপরকে দায়ী করছেন, আর কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বলছে, দল কাউকে ছাড় দিচ্ছে না।
পুলিশ ও দলীয় সূত্র জানায়, বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সীতাকুণ্ড পৌর সদরের একটি ক্লাবে একই সময়ে পৃথক কর্মসূচির আয়োজন করেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আসলাম চৌধুরী এবং উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী মোহাম্মদ সালাউদ্দিন। এ নিয়ে দুদিন ধরে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা চলছিল।
গত মঙ্গলবার দুপুরে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। ককটেল বিস্ফোরণের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি অস্ত্রের মহড়া চলে। এতে দুই পক্ষের অন্তত ৩০ জন আহত হন। ভাঙচুর করা হয় তিনটি মিনিবাস।
ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। পুলিশ জানায়, অস্ত্রধারীদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। দুই পক্ষই পরস্পরকে দায়ী করে দাবি করেছে, প্রতিপক্ষ বহিরাগত সন্ত্রাসীদের নিয়ে এসেছিল।
চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা পুলিশ সুপার রাসেল জানান, অস্ত্রধারী একজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে তার পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। পরে পুলিশ সিরাজুল ইসলাম ও সাদেক নামে দুই যুবককে অস্ত্র হাতে মহড়া দেওয়ার সময় শনাক্ত করে।
এ বিষয়ে আসলাম চৌধুরী বলেন, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে যা ঘটেছে, তা মূলত জুনিয়র নেতা-কর্মীদের নেতৃত্বের প্রতিযোগিতার কারণে হয়েছে। পদ-পদবি নিয়ে সাময়িক কিছু ভুল বোঝাবুঝি থাকলেও তা দ্রুত সমাধান হবে বলে আশা করেন তিনি। তিনি আশা প্রকাশ করেন, পারস্পরিক ভুল বোঝাবুঝি ও মনোমালিন্য দূর হলে সীতাকুণ্ড বিএনপি সাংগঠনিকভাবে আরো শক্তিশালী হয়ে উঠবে।
সুড়ঙ্গপথে পলায়ন, ওসিকে হুমকি
এর দুদিন পর গত শুক্রবার ভোরে নগরের খুলশী থানার ওয়্যারলেস মোড় ও পাহাড়তলী এলাকায় তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ও সাবেক স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগাকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে বাধার মুখে পড়ে পুলিশ।
অভিযানের সময় পুলিশের ওপর হামলা ও সরকারি গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে পরিবারের সহায়তায় বাসার ভেতরের একটি গোপন সুড়ঙ্গ দিয়ে পালিয়ে যান ওয়াকিল। এ ঘটনায় থানার ওসিসহ ছয় পুলিশ সদস্য আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ শব্দবোমা ব্যবহার করে।
এর আগে ২৯ আগস্ট নগরের পাহাড়তলী কলেজের এক শিক্ষককে তুলে নিয়ে মারধরের অভিযোগ ওঠে ওয়াকিল হোসেনের অনুসারীদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় খুলশী থানায় ওয়াকিলসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন ওই শিক্ষক। মামলা রেকর্ডের কারণে থানার ওসি আবদুর রহিমকে প্রকাশ্যে বিবস্ত্র করে পিটিয়ে এলাকা থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে ওয়াকিলের বিরুদ্ধে।
অস্ত্র উদ্ধার ও হামলার অভিযোগ
চলতি বছরের ২২ মার্চ রাঙ্গুনিয়ার সরফভাটা ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. ওসমানকে তার বাড়িতে গুলি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে জখম করে দুর্বৃত্তরা। ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন তার ৭০ বছর বয়সি মা আছিয়া বেগমও। স্থানীয়দের ধারণা, দীর্ঘদিনের আধিপত্যের বিরোধ থেকেই এ হামলা।
এর আগে গত বছরের ৩০ অক্টোবর র্যাবের অভিযানে রাউজানে বিএনপির কর্মী ও সাবেক চেয়ারম্যান খায়েজ আহমদের বাড়ি থেকে একটি বন্দুকসহ বিপুল পরিমাণ ধারালো অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় দুজনকে আটক করা হয়।
কোন্দলে প্রাণ গেছে ৫ জনের
গত দেড় বছরে চট্টগ্রামে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের অভ্যন্তরীণ বিরোধে অন্তত পাঁচজন নেতা-কর্মীর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।
২০২৫ সালের অক্টোবরে নগরের বাকলিয়ায় যুবদলের দুই পক্ষের গোলাগুলিতে ছাত্রদল কর্মী মো. সাজ্জাদ (২২) নিহত হন। রাজনৈতিক ব্যানার ছেঁড়াকে কেন্দ্র করে যুবদল নেতা এমদাদুল হক বাদশা ও সাবেক নগর ছাত্রদল সভাপতি গাজী সিরাজ উল্লাহর অনুসারীদের মধ্যে সংঘর্ষে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় করা হত্যা মামলায় ১৭ জনের নাম উল্লেখ করে আরো প্রায় ৪০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়। পুলিশ এজাহারভুক্ত ছয়জনসহ মোট আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে।
চলতি বছরের এপ্রিলে মীরসরাইয়ে নিজ দলের নেতাকর্মীদের হামলায় আহত ছাত্রদল নেতা শাহরিয়ার আহমেদ হৃদয় (২৩) চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। একই ঘটনায় আরেক যুবদল কর্মীর রগ কেটে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
জানুয়ারিতে রাউজানে গুলিতে নিহত হন যুবদল নেতা জানে আলম সিকদার। জুনে একই উপজেলায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় যুবদল নেতা মাকসুদুল হক চৌধুরী মাসুদকে। এ ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজে অস্ত্র হাতে তিনজনকে দেখা যায়। পুলিশ জানায়, হত্যাকাণ্ডে পাঁচ-ছয়জন জড়িত ছিল। জড়িত ব্যক্তিরা শীর্ষ সন্ত্রাসী রায়হান আলমের অনুসারী বলে জানা গেছে। তার সঙ্গে রাউজানের এক বিএনপি নেতার একাধিক ছবি পাওয়ার কথাও উল্লেখ করেছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
আগস্টে চান্দগাঁওয়ে সড়কে ভ্যান বসানো ও চাঁদা আদায়কে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে মারধরের শিকার হয়ে মারা যান যুবদল নেতা ফজলুল আমিন। তার পরিবারের অভিযোগ, নিজ দলের কর্মীরাই তাকে মারধর করেন। সবশেষ গত বৃহস্পতিবার রাউজানে প্রকাশ্যে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয় যুবদল কর্মী মুহাম্মদ করিমকে।
ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি দলের
চট্টগ্রামে গত দেড় বছরে বিএনপি-সংশ্লিষ্ট দলীয় কোন্দল, অস্ত্রের ব্যবহার, হামলা ও হত্যার অন্তত এক ডজন বড় ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব ঘটনার পাশাপাশি সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনাও রয়েছে।
জাতীয় পর্যায়ে দলীয় সূত্রের দাবি, ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর থেকে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের পাঁচ শতাধিক নেতা-কর্মীকে বহিষ্কার, পদ স্থগিতসহ বিভিন্ন সাংগঠনিক শাস্তি দেওয়া হয়েছে। তবে এর মধ্যে চট্টগ্রামের কতজন, তার আলাদা জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়নি।
বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, দলের নাম ব্যবহার করে কেউ কেউ দখলদারি ও চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়তে পারে। এ ধরনের অভিযোগে দল ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের চার শতাধিক নেতাকর্মীকে বহিষ্কার এবং অনেকের পদ স্থগিত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। দলীয় প্রধান তারেক রহমানের নির্দেশে দখলদারত্বে জড়িত কারো নাম পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে দাবি তার।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো নিয়ে চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, সন্ত্রাসী বা বিশৃঙ্খলাকারীর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় থাকে না। পুলিশের কাছে সন্ত্রাসী মানেই সন্ত্রাসী। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে পরিচয় বা রাজনৈতিক অবস্থান বিবেচনা না করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ কাউকে ছাড় দিচ্ছে না। সংঘর্ষ বা হামলায় যারাই জড়িত থাকুক, তদন্ত করে তাদের আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।
কেন্দ্রীয় বিএনপির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামীম বলেন, যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে, তারা প্রকৃত অর্থে দলের কেউ নয়। দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে সংঘাত, চাঁদাবাজি বা অস্ত্রবাজিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। প্রমাণ পেলে কাউকেই রেহাই দেওয়া হবে না।
